ভূমিধ্বস বিজয়ের মাধ্যমে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ২০০৮ সাল থেকে অনুষ্ঠিত হওয়া চারটি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে দলটি।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ১৯৭৩ সালে প্রথম নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নিয়ে ক্ষমতায় আসে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগ।
এরপর প্রায় দেড় দশকের সামরিক শাসন এবং আরো দশ বছর সংসদীয় গণতন্ত্রের আড়ালে ধর্মীয় চরমপন্থিদের উত্থানের সময় বেশ ভুগতে হয়েছিলো দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলটিকে।
কিন্তু ২০০৮ সাল থেকে রাজনৈতিকভাবে দৃঢ় ও সংগঠিত আওয়ামী লীগের সামনে আর দাঁড়াতেই পারেনি সামরিক শাসকদের হাতে তৈরি এবং ধর্মীয় মতাদর্শের ওপর গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দলগুলো।
রোববার অনুষ্ঠিত হওয়া দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৮টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট পেয়েছে ২২৪ আসন। এরমধ্যে আওয়ামী লীগ ২২২ এবং ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ একটি করে আসন। বাকী আসনগুলোর মধ্যে স্বতন্ত্র ৬২, জাতীয় পার্টি ১১ ও কল্যাণ পার্টি পেয়েছে ১টি আসন।
৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে এক প্রার্থীর মৃত্যুতে একটি আসনে ভোট হয়নি, আর এক আসনের একটি কেন্দ্রে ভোট স্থগিত থাকায় ফল ঘোষণা করা হয়নি।
২০১৪ সালের মতো এবারের নির্বাচনও বয়কট করে ভোটের বাইরে থেকেছে বিএনপি। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানে হাতে গড়া এই দলটি গত এক দশকের মধ্যে এ নিয়ে দুই সংসদীয় নির্বাচনে ভোটের বাইরে থাকলো, যা নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
রোববার অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া নির্বাচনকে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটের নজির স্থাপনকারী হিসেবে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরা। ৪০ শতাংশের মতো ভোট পড়েছে, যা স্বস্তি দিয়েছে নির্বাচন আয়োজকদের।

দেশের ৪৪টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৭টি দল ভোটে অংশ নেয়। কিন্তু ২২টি দল কোনো আসন পায়নি। অপেক্ষাকৃত নতুন রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের মাঝে সাড়া ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে।
গত দুই সংসদে বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করা জাতীয় পার্টির জন্য এবার ২৬টি আসনে ছাড় দেয় আওয়ামী লীগ। ওই আসনগুলোতে নৌকার প্রার্থী না থাকলেও বেশিরভাগ জায়গাতেই হেরেছে প্রয়াত সাবেক সেনাশাসক এরশাদের হাতে গড়া রাজনৈতিক দলটি প্রার্থীরা।
গতবারের তুলনায় জাতীয় পার্টি আসন সংখ্যা একটানে নেমেছে অর্ধেকে। লাঙ্গলের প্রার্থীরা জিততে পেরেছে ১১টি আসনে।
যদিও দলটি প্রথমে ২৮৯ আসনে দলীয় লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী দেয়। পরে কয়েকটি আসন থেকে প্রত্যাহার করে নেয় এবং কিছু প্রার্থী স্বেচ্ছায় বসে পড়ে।
কিন্তু ভোটের মাঠে লাঙ্গলের প্রার্থীদের মারাত্মক চ্যালেঞ্জে ফেলে দেয় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এদের কারণেই আওয়ামী লীগের ছেড়ে দেয়া ১৫টি আসনে জিততে ব্যর্থ হয়েছে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা।
অংশগ্রহণমূলক ভোটের স্বার্থে এবারের নির্বাচনের শুরুতেই দলীয় নেতাদের জন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত করে দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
তাই এবার রেকর্ড সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী দেখা যায় ভোটের মাঠে। জাতীয় পার্টির পাশাপাশি আওয়ামী লীগেরও অনেক প্রার্থীকে নাকানিচুবানি খেতে হয়েছে স্বতন্ত্রের হাতে। এদের মধ্যে রয়েছেন কয়েকবার নির্বাচিত হওয়া অনেক অনেক ভেটেরান সংসদ সদস্য।
মোট সংসদীয় আসনের প্রায় ২০ শতাংশ জিতেছে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এর আগে আর কখনো এতো স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য দেখা যায় নি।
নির্বাচন কমিশন থেকে গেজেট প্রকাশের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন। এরপর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন রাষ্ট্রপতি।
টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হতে যাওয়া শেখ হাসিনা এই নিয়ে হবেন পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ে নারী প্রধানমন্ত্রী, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের সরকার প্রধানও।
এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে স্মার্ট বাংলাদেশে গঠনের প্রুতিশ্রুতি দিয়েছে আওয়ামী লীগ। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশকে দারিদ্রমুক্ত ও অবকাঠামো উন্নয়ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বাংলাদেশর উন্নয়ন মডেল আলোচিত হচ্ছে বহু দেশে।
টানা চতুর্থবারের জয়ে ইতোমধ্যেই শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারত, চীন, রাশিয়া, ভুটান, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, পাকিস্তান, ব্রাজিল, মরক্কোসহ বিভিন্ন দেশ।
২৬ থেকে নেমে ১১ তে জাতীয় পার্টি
যাদের নৌকা ডুবলো
শেখ হাসিনাকে ভারত, রাশিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশের অভিনন্দন