সব কিছু ঠিক থাকলে বুধবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন। তবে এখন সবচেয়ে আলোচনার তুঙ্গে, এই সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে কোন দল। দিনভর এই নিয়ে ক্ষমতাসীন দল ও সরকার থেকে নানা কথা বলা হলেও, কে হবে সংসদে প্রধান বিরোধী দল সেটি এখনও স্পষ্ট হয়নি। ফলে এনিয়ে ধোঁয়াশা এখনো কাটছে না।
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে টানা চতুর্থবার সরকার গঠন করতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। আর দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা যে আবারও সংসদীয় দলের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা নিয়ে কারও মধ্যে সংশয় নেই। তবে এই সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন, তা নিয়ে এখনও আলোচনা তুঙ্গে। চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে সামাজিক মাধ্যমে এনিয়ে আলোচনার চলছে, চায়ের কাপে উঠেছে ঝড়।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পর বড় দল হিসাবে সবচেয়ে বেশি ১১ আসন পেয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের প্রতিষ্ঠিত দল- জাতীয় পার্টি (জাপা)। কিন্তু দলটির চেয়ে পাঁচ গুণের বেশি সংখ্যক আসন পেয়েছে ভোটের মাঠে শুরু থেকেই আলোচনার তুঙ্গে থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা । যাদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। দলীয় সভাপতির অনুমতি নিয়েই তারা ভোটের মাঠে লড়েছেন।
এ কারণে, সংসদের বিরোধ দলের বিষয়টি পরিস্কার না হলেও এটা মোটামুটি নিশ্চিত যে, সংসদের বিরোধী দল কারা হবে সে সিদ্ধান্তও সরকারের পক্ষ থেকেই আসবে। কারণ স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী হওয়ার কারণে দলের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকবে না তাদের। স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও বলেছেন, সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটিই মেনে নেবেন তারা।
রাজনীতি ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা চাইলে বিরোধী দল হিসেবে থাকতে পারেন। আবার তারা যেহেতু আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথেও জড়িত, তাই তারা এই দলটিতেও যোগ দিতে পারেন। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কী করবেন তা পুরোপুরি আওয়ামী লীগের দলীয় সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে করছে বলেও মনে করেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হওয়ার পর বিরোধী দল কারা, অলরেডি বিরোধী দল জাতীয় পার্টির তো অনেকেই জিতেছেন, ১৪ দলেরও দু’জনের মতো জিতেছেন। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তো দূরে নয়। যিনি লিডার অব দ্যা হাউজ হবেন, তিনি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন।

সংসংদে বিরোধী দল করা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, পদ্ধতিটা কেন আপনাকে বলব? এটা নতুন সরকার বসুক। সংশ্লিষ্ট যারা আছে তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করবেন। সব বাস্তবতার নিরিখে সিদ্ধান্ত নেবেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী, নতুন লিডার অব দ্যা হাউজ পরিস্থিতি, বাস্তবতা, করণীয় বিষয়ে অবশ্যই সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী। এজন্য সবাইকে অপেক্ষায় থাকতেও অনুরোধ করেন তিনি।
এদিকে, বিরোধী দল করা হবে এমন প্রশ্নের উত্তরে একাদশ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ, আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসন থেকে সপ্তমবারের মতো নির্বাচিত সংসদ সদস্য নূর-ই-আলম চৌধুরী বলেন, বিরোধী দলের ব্যাপারে তো সরকারি দলের করণীয় কিছু নাই। বিরোধী দলের যারা আছেন তারা মিলে সংবিধানের আলোকে ঠিক করবেন।
সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারি দলের পাশাপাশি সংসদে বিরোধী দলের ভুমিকাও প্রায় সমান। বিরোধী দলের নেতা পান রাষ্ট্রীয় সব সুযোগ সুবিধা। এবারের নির্বাচনে ২২২টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পর সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। প্রশ্ন উঠছে, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিরোধী দল গঠন করবে কিনা।
আইন ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, দ্বাদশ সংসদে বিরোধী দল কারা হবে, তা নির্ধারণ করছে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অবস্থানের ওপর। স্বতন্ত্ররা যদি মনে করেন, তারা সরকারের সঙ্গে না থেকে নিজেরা একটা মোর্চা করবেন। অবশ্যই তারা সেটা করতে পারবেন। তখন বিরোধী দল হিসেবে কাকে স্বীকৃতি দেয়া হবে, সেটা জানা যাবে; কিন্তু আমার মনে হয়, বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন প্রয়োজন। স্বতন্ত্রদের যথেষ্ট আসন আছে। ৬২টি আসনে তারা জয়ী হয়েছেন।
স্বতন্ত্ররা তো আওয়ামী লীগেরই, তাহলে বিরোধী দলও একই দলের হয়ে গেল না- এই বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, যারা স্বতন্ত্র নির্বাচিত হয়েছেন তারা আওয়ামী লীগ হিসেবে নির্বাচিত হননি। তাদের প্রতীকও ভিন্ন ছিলো। নৌকা মার্কায় কেবল আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। কাজেই স্বতন্ত্ররা আওয়ামী লীগার, এটা মুখের কথা হতে পারে, কিন্তু আইনের কথা বা বাস্তবতার কথা সেটা না।

আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরাও প্রায় একই কথা বলছেন। তাদের মতে আইনে এটা ‘সম্ভব’। সংসদে বিরোধী দল কিংবা বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনের বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার স্পিকারের। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয় পাওয়া একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা বলেছেন, তারা শপথ নেওয়ার পর এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য বসবেন।
সুপ্রিম কোর্টের জেষ্ঠ্য আইনজীবী আহসানুল করীম বলেছেন, আইনে রাজনৈতিক দলের কাঠামো বেঁধে দেয়া আছে। সেই কাঠামো মেনেই নির্বাচনে অংশ নিতে হয়। তাই স্বতন্ত্রদের বিরোধী দল হবার সুযোগ নেই। সংখ্যায় যত কমই হোক দ্বিতীয় বৃহত্তম দলই হবে বিরোধী দল। স্বতন্ত্ররা যেহেতু প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ নেতা, তাই তারা বিরোধী মোর্চা গঠন করলে, সেটি হবে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পরিপন্থী।

সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক বলেন, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ৬২ জন হলেও একা একা তাদের বিরোধী দল হওয়ার সুযোগ নেই। তবে তারা সংসদে থাকা অন্য কোনো দলকে সমর্থন দিতে পারে। যে দলের সমর্থন বেশি হবে তারাই হবে বিরোধী দল। আর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আলাদাভাবে জোট করতে পারে, তখন ওই জোটে কতজন হবে, সেই হিসেবে তারাও বিরোধী দল হতে পারে।
স্বতন্ত্রের জোট করার ঘটনাও রয়েছে নিকট অতীতে। দশম সংসদেই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জোটবদ্ধ হন। সাড়ে তিন বছর পর, আবার তারা দল বেঁধে আওয়ামী লীগে ফিরেও গিয়েছিলেন। এবারও যদি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জোটবদ্ধ হয়ে কাউকে নেতা নির্বাচন করেন, তাহলে জাতীয় পার্টির প্রধান বিরোধী দল আর বিরোধীদলীয় নেতা হবার কোন সুযোগ আর থাকবে না বলেন মনে করেন একাধিক বিশেষজ্ঞ।
জাতীয় পার্টি দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ দল না হলেও, ২০১৪ সালে বিএনপির বর্জনের সুযোগে সংসদে সেই মর্যাদা তারা পেয়ে যায়। সেবার দলটি ৩৪টি আসন পায়। নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নে জোরালো অবস্থান নেওয়া রওশন এরশাদকে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচন করা হয়। এরপর ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে যোগ দেয় বিএনপি ও তাদের শরিকরা।
জাতীয় পার্টি তখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করেই নির্বাচনে যায়, আসন পায় ২২টি। বিএনপি ও তাদের জোটের আসন ছিলো আটটি। সে নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টি মহাজোট থেকে বেরিয়ে এসে আবার বিরোধী দলে বসে। বিরোধীদলীয় নেতা হন পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার মৃত্যুর পর আবার বিরোধী দলীয় নেতা হিসাবে আবিভূত হ হন রওশন। এনিয়ে দলের মধ্যে বড় টানপোড়েন তৈরিও হয়।
২২২ আসন পেয়ে আওয়ামী লীগের সরকারে থাকা নিশ্চিত হয়েছে। তবে বিরোধী দলে কারা বসবে, সে প্রশ্ন এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। জাতীয় পার্টির আছে ১১, অন্যদিকে দলটির চেয়ে প্রায় ছয় গুণ বেশি ৬২টি আসন রয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দখলে। এই ৬২ জনের মধ্যে ৫৯ জনই আওয়ামী লীগ নেতা। বাকিদের একজন জাতীয় পার্টির মনোনয়ন না পেয়ে, একজন বিএনপি ছেড়ে এসে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জিতেছেন।
১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় নির্বাচনের পর যে সংসদ গঠন হয়, তাতে বিরোধীদলীয় নেতার আসনে কেউ বসেননি। সেবার ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ একাই পায় ২৯৩টি। একটি করে আসন পায় জাসদ ও জাতীয় লীগ। বাকি পাঁচটি আসন পান স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা। জাতীয় লীগের নেতা আতাউর রহমান খানকে বিরোধীদলীয় নেতা করার প্রস্তাব উঠলেও, সংসদ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আপত্তি জানান।
তিনি বলেন, বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে একটি রাজনৈতিক দলের অবশ্যই কমপক্ষে ২৫টি আসন থাকতে হবে। না হলে তাদেরকে পার্লামেন্টারি গ্রুপ হিসেবে বলা যেতে পারে, কিন্তু বিরোধী দল নয়। ফলে সেই সংসদে বিরোধী দল বলে কিছু ছিলো না।
১৯৮৮ সালে বিতর্কিত চতুর্থ জাতীয় নির্বাচনের পরও একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি এককভাবে ২৫১টি আসনে জয় পেয়েছিল। অন্যদিকে জাসদের নেতৃত্বে সম্মিলিত বিরোধী দল পেয়েছিল ১৯টি আসন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছিল ২৫টি আসন। এছাড়া জাসদ তিনটি ও ফ্রিডম পার্টি দুইটি আসন পায়। জাতীয় পার্টি ক্ষমতা নেয়ার পর, ফ্রিডম পার্টি ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের সমর্থন নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন জাসত নেতা আ স ম আব্দুর রব সংসদ।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ, এরশাদের জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও বামপন্থী জোট ছাড়াই নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে ২৭৮টিতে জয়ী হয় বিএনপি। ১০টি আসনে স্বতন্ত্র এবং একটিতে ফ্রিডম পার্টিকে বিজয়ী দেখানো হয়। বাকি ১১টি আসনের মধ্যে ১০টিতে কাউকে বিজয়ী দেখানো হয়নি। একটিতে ভোট স্থগিত ছিলো। এই সংসদের মেয়াদ ছিলো মাত্র ১১ দিন।
