পাকিস্তানে বিগত সাত দশকের ইতিহাসে প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন নওয়াজকন্যা মরিয়ম নওয়াজ। তিনি বাবার পথে হেঁটে দেশটির সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছে। তবে এই পর্যায়ে আসতে অনেক পথ পেরুতে হয়েছে পাকিস্তান রাজনীতির এই লৌহমানবীকে।
পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএলএন) প্রধান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের পরিবার দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী পরিবার। দেশটির রাজনীতিতে এই পরিবারের প্রভাবেকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। বলা হয় রাজনীতির মাঠে ভুট্টো পরিবারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে কেবল শরীফ পরিবারই।
আর সেই শরীফ পরিবারেরই অন্যতম ক্ষমতাবান নারী সদস্য হলেন মরিয়াম নওয়াজ। প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য হলেও রাজনীতির মাঠে বেশ কাঠখড় পুড়িয়েই তাঁকে আজকের পর্যায়ে আসতে হয়েছে। মুখোমুখি হতে হয়েছে অনেক অবাঞ্চিত পরিস্থিতির শিকার। সেনাবাহিনীর সঙ্গেও জড়িয়েছেন বিবাদে।
রাজনৈতিক সংগ্রাম ও কারাবাসের মতো কষ্ট সহ্য করার পাশাপাশি অক্লান্ত পরিশ্রম ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের জন্য মরিয়ম নওয়াজকে তার দল পিএমএল-এনের মধ্যেই একজন ‘আয়রন লেডি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। সেই সঙ্গে কঠিন পার্সোনালিটির জন্যও দল তাঁকে যথেষ্ঠ সমীহ করে।
নওয়াজের দল পিএমএল-এন বর্তমানের রাজনীতির ময়দানে যেভাবে আগ্রাসী মনোভাব দেখিয়ে যাচ্ছে তার পথ প্রদর্শক হিসাবে মরিয়ম নওয়াজকেই বিবেচনা করা হয়। তাঁকে ২০১৭ সালে বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী নারীর তালিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এখন তিনি সেই তালিকাতে আছেন।
পানামা পেপারস মামলার রায়ের পর আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক পথ অবলম্বন করেন মরিয়ম নওয়াজ এবং তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেন। ১৯৯৯ সালে যখন নওয়াজ শরিফ সরকারকে বরখাস্ত করা হয়েছিল, তখন তিনিও কষ্ট পেয়েছিলেন।
চার মাস গৃহবন্দী থাকার পর তাকে সৌদি আরবে নির্বাসিত করা হয়। ২০১৩ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর যুব কর্মসূচির দায়িত্ব পান এবং যুবকদের ল্যাপটপ ও বৃত্তি দিয়ে দলকে জনপ্রিয় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই সময়ে তিনি দলের জন্য একটি সংগঠিত সামাজিক মিডিয়া সেল প্রতিষ্ঠা সক্ষম হন।
এর মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দলের বর্ণনা চালু করতে শুরু করেন মরিয়ম। ফলে তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি বেশ জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন। এরই ধারায় ২০১৮ সালের নির্বাচনে তাকে জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদের জন্য টিকিট দেয়া হয়েছিল।
কিন্তু নির্বাচনের আগে তাকে অ্যাভেনফিল্ড রেফারেন্সে সাত বছরের সাজা দেয়া হয় এবং ১০ বছরের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। তিনি কারাগারে বি-শ্রেণীর সুযোগ-সুবিধা নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং সাধারণ কয়েদিদের মতো কারাভোগ করেন। যা তাঁকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায় বলে মনে করা হয়।
জেল থেকে বেরিয়ে মরিয়ম সারাদেশে সমাবেশ করতে থাকেন এবং শাসক ও শাসনকে চ্যালেঞ্জ করেন। রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশ হিসেবে তিনি করাচিতে পৌঁছালে তার স্বামীকে হোটেলের রুমের দরজা ভেঙ্গে গ্রেফতার করা হয়। মরিয়ম নওয়াজের বক্তৃতা সম্প্রচারেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছি।
তার ক্ষমতা-দক্ষতা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসাবে পিএমএল-এন তাকে প্রধান সংগঠক এবং সিনিয়র সহ-সভাপতি নিযুক্ত করে। তিনি তার বাবাকে দেশে ফিরিয়ে আনেন এবং ৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দল হিসাবে সর্বোচ্চ আসনে পেতে মূখ্য ভূমিকা পালন করেন মরিয়ম নওয়াজ।
মরিয়ম নওয়াজের জন্য অবিশ্বাস্য নিরাপত্তা