গেল বছরের ৭ অক্টোবর থেকে গাজা উপত্যকায় লাগাতার হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে আসছে ইসরাইল। ৩২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যার পরও থামার কোন লক্ষণ নেই, উল্টো হামলার পরিধি আরও বাড়িয়েছে দেশটি। একবার যুদ্ধবিরতি হলেও, এনিয়ে চলছে টালবাহানা। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ইসারাইল আসলে কী চায়। এক কথায় উত্তর ফিলিস্তিনিদের জন্য কোন স্বাধীন ভূমি দেখতে চায় না তেল আবিব।
কিন্তু সেটি কিভাবে সম্ভব, এনিয়েই সময়ে সময়ে বেরিয়ে এসেছে নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব। তারই একটি হলো, গাজা উপত্যাকাকে পুরোপুরি মনুষ্যহীন ভূখন্ডে পরিণত করতে চায় ইসরাইলি হায়েনারা। আর সেই কৌশল তারা খাটাতে চেয়েছিল মিশরকে দিয়ে। অর্থাৎ গাজাকে ছলে বলে কলে কৌশলে দখলে নেয়ার পাঁয়তারা করছিল তারা, সেই ইঙ্গিতও বহু আগেই দিয়ে রেখেছিলেন মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি।
ইসরাইলের এমন ষড়যন্ত্রের আভাস আগেই টের পেয়েছিলেন তিনি, তাই গাজায় যুদ্ধ হলেও শরণার্থীদের ঢলকে মিশরে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি তার সরকার। সিসি বলেছিলেন, এই শরণার্থীদের মিশরে প্রবেশ করতে দিলে একই দশা হবে পশ্চিমতীরেও। সেখানকার মানুষকে একই কায়দায় জর্ডানেও পাঠানো হবে। ফলে ফিলিস্তন ভূখণ্ড পড়ে থাকবে অথচ একটি মানুষও সেখানে থাকবে না।

অর্থাৎ এই প্রক্রিয়ায় ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড থেকে বের করে দিতে পারলে পুরো ভূমি পড়ে থাকবে অরক্ষিত। তিনি সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, গাজার বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোকে মিশরে আশ্রয় দিলে একই পরিণতি হবে পশ্চিমতীরের ফিলিস্তিনিদের। আর তাতে করে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ তখন ভূমি পড়ে থাকবে, থাকবে না ভূমির মানুষগুলো।
ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকে ফাঁস হওয়া গোপন নথির বরাত দিয়ে প্লাস নাইন সেভেন টু ম্যাগাজিন ও লোকাল কলে প্রকাশিত হয় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের মিশরে পাঠিয়ে দেয়ার প্রস্তাব ছিলো ওই গোপন নথিতে। ফিলিস্তিনিদের হঠাতে ভয়ঙ্কর পদক্ষেপও নিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের কসাই হিসাবে পরিচিত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু’র তাবেদার সরকার। কি চেয়েছিলেন নেতানিয়াহু?
গুঞ্জন রটে, ফিলিস্তিনিদের গ্রহণে মিশরের ১৬০ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ শোধ করে দেয়ার প্রস্তাবনাও রেখেছিল ইসরাইলি নেতারা। সিসিকে রাজি করাতে ইউরোপীয় নেতাদের কাছে লবিং করেছিলো ইসরাইলি সরকার। যদিও এ ধরণের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন মিশরের প্রেসিডেন্ট। দেশটির রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরাও একমত যে, ফিলিস্তিনিদের জোর করে স্থায়ীভাবে গাজা থেকে বের করে দিতে চায় ইসরাইল।

গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোর করে বাস্তুচ্যুত করার পাশাপাশি আরও চমকপ্রদ খবর দিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। জানিয়েছে, ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে মনোরম রিসোর্ট করার পরিকল্পনাও করেছিল তেল আবিব। সেই সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরের স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণও নিজের হাতে নেয়ার দুরভিসন্ধী এটেছিলো ইসরাইল।
এর বাইরেও আরেকটি শঙ্কা প্রকাশ করেছেন মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি। তার মতে, বিপুল ফিলিস্তিনিদের মিশরে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিলে দেশের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। যদি গাজা থেকে শরণার্থীদের ঢল মিশরের সিনাই অঞ্চলে শুরু হয়, তাহলে তা ইসরাইলের বিরুদ্ধে নতুন এক অপারেশনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
সেই সাথে নিজের আত্মরক্ষা ও নিরাপত্তা রক্ষার অধিকারও আছে ইসরাইলের। যদি নতুন ওই অপারেশন কেন্দ্র থেকে ইসরাইলে হামলা করা হয়, তাহলে মিশরের ভূমিতে সরাসরি হামলা করবে ইসরাইল। এটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। পাশাপাশি হামাসের থেকেও ছোট ছোট সশস্ত্র গোষ্টী মিশরে প্রবেশ করবে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। হামাস ও মুসলিম ব্রাদারহুডের মধ্যে সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও উদ্বিগ্ন মিশর।

আগের বছর ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির পর ইসরাইলের সঙ্গে প্রথম আরব রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৭৯ সালে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে মিশর। তবে ইসরাইলের বিরুদ্ধে জনমত থেকে যায় ব্যাপকভাবে। দুই দেশই নিরাপত্তা সহযোগিতা ও মসৃণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আর সেই শান্তিও এখন ঝুঁকিতে বলেও মন্তব্য করেছেন সিসি।
পাশাপাশি গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষদের মিশরে আশ্রয় দেয়া হলে তাকে দ্বিতীয় নাকবা হবে বলে সতর্ক করেছিলেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসও। নাকবা হলো ১৯৪৮ সালে কমপক্ষে ৭ লাখ ৬০ হাজার ফিলিস্তিনির দেশ ছেড়ে যাওয়া বা জোর করে দেশ থেকে বের করে দেয়া। এর ফলেই ইসরাইলের সৃষ্টি।
