রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মস্কোর কনসার্ট হলে হামলাকারী সন্ত্রাসীরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র এবং দাহ্য তরল ব্যবহার করেছিল। গুলি করে শতাধিক মানুষকে হত্যা ও আরও দেড়শ’ জনকে জখম করার পর ভবনটিতে ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তদন্তকারীরা বিশ্বাস করেন, ইউক্রেনের সাথে হামলাকারীদের যোগাযোগ ছিলো। এই বিষয়ে আরও তথ্য জোগাড় করছেন তারা।
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা- এফএসবি’র কর্মকর্তারা শনিবার বলেছেন, সন্ত্রাসীরা ক্রোকাস সিটি হলে হামলা করার পর রাশিয়া-ইউক্রেনীয় সীমান্ত অতিক্রম করতে চেয়েছিল এবং ইউক্রেনের সঙ্গে তাদের সব সময়ই যোগাযোগ ছিলো। হামলার সময়ও যথাযথ পক্ষের সঙ্গে হামলাকারীরা যোগাযোগ করেছিলো।
তারা জানিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যায় রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর ক্রাসনোগরস্ক এলাকার ক্রোকাস সিটি হল অ্যান্ড শপিং সেন্টারে হামলাকারীরা শতাধিক মানুষকে গুলি করে হত্যা করার পর, বিশেষ ধরনের তরল দাহ্য পদার্থ দিয়ে ঘটনাস্থলে আগুন ধরিয়ে দেয়, যাতে তাদের পালাতে সুবিধা হয়।
ক্রোকাস হলে যেভাবে হামলা

থিয়েটারে হামলায় অংশ নেয়া চার সন্ত্রাসীর পড়নে ছিল ক্যামোফ্লজ গিয়ার বা সৈনিকদের মতো পোশাক। তারা সবাই ছিলো কালাশনিকভ অ্যাসল্ট রাইফেলে সজ্জিত। একটি মিনিভ্যানে করে স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে ক্রোকাস সিটি হলে পৌঁছায়।
সেখানের প্রবেশ মুখে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে সামনে এসে পড়া ব্যক্তিদের পয়েন্ট ব্লাঙ্কে করতে শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, তারা অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ পথের কাছে কাঁচের দরজা গুলি করে ভেঙ্গে ফেলে, তারপর কনসার্ট হলের দিকে এগিয়ে যায়।
ঘটনাস্থলে ধারণ করা বিভিন্ন মোবাইল ফোনের ভিডিওতে দেখা গেছে, থিয়েটার হলের ভেতরে প্রবেশ করে সন্ত্রাসীরা আগত দর্শকদের উপর এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে। ওই সময় হলের মধ্যে থাকা দর্শকরা ছুটে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তাদের লক্ষ্য করেও গুলি চালিয়েছে হামলাকারীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় হামলা মুহূর্ত

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী রয়টার্সকে বলেন, হঠাৎ আমাদের পেছনে গুলির শব্দ হলো; এরপরই বিরাট বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই। তখন হলের ভেতরে ছোটাছুটি শুরু হয়ে যায়। সবাই দৌড়ে এস্কেলেটরের দিকে চলে যায়। সবাই চিৎকার করছিল; সবাই দৌড়াচ্ছিল।
ঘটনার অন্যান্য ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, দর্শকরা সবে মাত্র থিয়েটার হলের মধ্যে তাদের আসন গ্রহণ করছে, তারপরে বৃষ্টির মতো বন্দুকের গুলির শব্দ আর চিৎকারে গোটা পরিবেশ প্রকম্পিত হয়ে উঠছে আর সেই সঙ্গে সবাই বের হবার পথের দিকে ছুটে যাচ্ছেন।
এরপর হামলাকারীরা পর্দা ও চেয়ারে দাহ্য তরল ঢেলে কনসার্ট হলে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রায় ১৩ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগেছিল। কনসার্ট হলের ছাদ ধসে পড়ে। সেখানে এখন পুরোদমে উদ্ধার অভিযান চলছে।
রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় ১১৫ জন নিহত হয়েছে, তবে মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা ১৫০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে। আহত হয়েছে আরও দেশ শতাধিক। এদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই গুরুতর। ফলে নিহতের সংখ্যা বাড়তে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হামলার দায় নিলো আইএসআইএস-কে

ক্রোকাস সিটি হলে হামলার দায় নিয়েছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)। তবে আইএসের যে অংশ এই হামলার সঙ্গে জড়িত তাদের নাম আইএস-কে বা ইসলামিক স্টেট খোরাসান। খোরাসান অঞ্চলে সক্রিয় থাকা এই গোষ্ঠী ‘ইসলামিক স্টেট খোরাসান’ বা আইএস-কে নামে ২০১৪ সালের শেষ দিকে যাত্রা শুরু করে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া এক পোস্টে আইএসের পক্ষ থেকে দায় স্বীকার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। পোস্টে আইএসআইএস-কে লেখে, মস্কোর কাছে একটি কনসার্টে সমবেত বিশাল সমাবেশ হামলা চালানো হয়েছে। হামলাকারীরা নিরাপদে আছে, নিজেদের ঘাঁটিতেও ফিরে গেছে।
ইউক্রেনের দিকে আঙুল ক্রেমলিনের

রুশ গোয়েন্দারা বলেছে, হামলাকারীদের সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্কে আছে এবং দেশটির উপযুক্ত পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। গেলো দুই বছর ধরে ইউক্রেনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে রাশিয়া। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলাকারীরা যখন গ্রেপ্তার হয়, তখন তারা ইউক্রেনে পালানোর চেষ্টা করছিলো।
ইউক্রেন এ খবর অস্বীকার করেছে এবং বলেছে হামলার সাথে তাদের কিছু করার নেই। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান গোয়েন্দা অধিদপ্তর বলেছে, মস্কোতে সন্ত্রাসী হামলাটি ছিল পুতিনের নির্দেশে পরিকল্পিত একটি ঘটনা এবং ইচ্ছাকৃত উস্কানি। এর উদ্দেশ্য ছিল ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধ আরও প্রসারিত করা।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির কার্যালয় বলেছে, মস্কোর কনসার্ট হলে হামলার সঙ্গে কিয়েভের কোনো সম্পর্ক নেই। জেলেনস্কির সহযোগী মাইখাইলো পোদোলিয়াক বলেন, এটা অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। এই ঘটনার সাথে ইউক্রেনের কোনো সম্পর্ক নেই।
রাশিয়ার এফএসবি সিকিউরিটি সার্ভিসের পরিচালক জানান, এই ঘটনায় ১১ জন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। ক্রেমলিনের বরাত দিয়ে ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে, এর মধ্যে হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত চার সন্ত্রাসী রয়েছে। একটি গাড়িকে ধাওয়া করে ব্রায়ানস্ক অঞ্চলে প্রথমে দুই সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়।
রাশিয়ার এফএসবি সিকিউরিটি সার্ভিস জানিয়েছে, মস্কোর কনসার্ট হল হামলার সন্দেহভাজন অপরাধীরা ইউক্রেন সীমান্তের দিকে যাচ্ছিল। এফএসবি বলেছে, অপরাধীদের ইউক্রেনে যোগসাজশ ছিলে। তবে এই প্রেক্ষিতে আরও তথ্য বা প্রমাণ সরবরাহ করেনি।
ক্রোকাস সিটি হলে উদ্ধার অভিযান চলছে

শনিবার রুশ সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে । সোভিয়েত-আমলের রক ব্যান্ড ‘পিকনিকের’ এই কনসার্টে পারফর্ম করার কথা ছিল। ব্যান্ডের সদস্যরা সবাই জীবিত এবং নিরাপদ বলেই জানা গেছে। তারা মঞ্চের পেছনে রাখা আসনের পেছনে লুকিয়ে তাদের জীবন বাঁচান।
মস্কোর এই হামলায় আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শিশুও রয়েছে। মস্কোর গভর্নর আন্দ্রে ভোরোবিওভ বলেন, উদ্ধারকর্মীরা কনসার্ট হলের ধ্বংসস্তূপের মধ্য তল্লাশি চালাবেন। উদ্ধারকারীরা দুর্ঘটনাস্থলে চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করছে। উদ্ধার কাজ শেষ হতে অন্তত আরো কয়েক দিন চলবে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সন্ত্রাসী হামলায় আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন। উপ-প্রধানমন্ত্রী তাতায়ানা গোলিকোভাকে উদ্ধৃত করে রাশিয়ার সংবাদ সংস্থাগুলো জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট সবার দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন এবং চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
চরম বদলা নেয়ার হুঁশিয়ারি মেদভেদেভের

মস্কোতে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার বদলা নেয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা রাশিয়ান সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ। সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়ে পুতিনের এই মুখপাত্র বলেছেন, জড়িতদের শাস্তি দেয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
মেদভেদেভ আরও বলেন, হামলাকারীদের সবাইকে খুঁজে বের করতে হবে এবং রাষ্ট্রের কর্মকর্তাসহ যারা এ ধরনের নৃশংসতা চালিয়েছে তাদের নির্দয়ভাবে ধ্বংস করতে হবে। ক্রোকাস সিটি হলে সন্ত্রাসী হামলার পর ১১ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যার মধ্যে চারজন যারা সরাসরি হামলায় অংশ নিয়েছিল।
