সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং টার্মিনাল উইথ ডাবল পাইপ লাইন (এসপিএম) প্রকল্পের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র থেকে সরাসরি পাইপ লাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল মহেশখালী হয়ে চট্টগ্রামে নিয়ে আসার ডাবল পাইপ লাইন নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ। চলতি বছরই এই প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে। এই লাইনের নির্মাণের ফলে বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তবে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে দীর্ঘ সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির সমালোচনা করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
গভীর সমুদ্র থেকে দুটি পাইপ লাইনের মাধ্যমে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল মহেশখালীর ডিপো হয়ে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আনার প্রকল্পটি নেয়া হয় ২০১৫ সালে। চার হাজার ৯৩৫ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ শেষ হবার কথা ছিলো ২০১৮ সালে। পরে বাড়ানো হয় প্রকল্পের মেয়াদ, বাড়ে খরচও।
দ্বিতীয় দফায় ২০২০ সালে কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন, পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান শামসুর রহমান।
কিন্ত একে একে চার দফায় বেড়েছে প্রকল্পের মেয়াদ ও খরচ। ২০১৮ সালের জায়গায় কাজ শেষ হচ্ছে ২০২৪ সালে। আর ব্যয় দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৩৪১ কোটি টাকা।

প্রকল্প বাস্তবায়নে এমন দীর্ঘসূত্রিতা ও ব্যয় বাড়ার সমালোচনা করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম। বলেন, চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প যদি আট হাজার কোটি টাকা হয় তবে এর পেছনে কী যুক্তি আছে এবং কেন করা হলো তা তদন্ত করা উচিত। একই সঙ্গে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে কোম্পানিকে অবশ্যই জরিমানা করা উচিত।
তিনি বলেন, এটা যে শুধু এসপিএমের ক্ষেত্রে হচ্ছে তা নয়, সব ক্ষেত্রেই এমনটা দেখা যাচ্ছে। এট আমাদের বন্ধ করতে হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে গভীর সমুদ্র থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই তেল খালাস হবে। বর্তমানে ছোট ছোট জাহাজের মাধ্যমে তেল খালাসে সময় লাগে প্রায় ১২ দিন। এতে বছরে হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে জানালেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

তিনি বলেন, তেল নামানো, গাড়িতে তোলা এতে বড় একটা পিলফেরেজ হয়। একই সঙ্গে তেল ক্যারি করা; এতে আমাদের সাশ্রয় হবে হাজার কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ তেলের যে আমাদের বিভিন্ন ধরনের লস ছিল, এই লসগুলো আমরা কমিয়ে আনবো।
স্মার্ট জ্বালানি খাত বিনির্মাণে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও জানান তিনি।
চট্টগ্রামের গভীর সমুদ্র থেকে দ্বৈত পাইপ লাইনের মাধ্যমে পেট্রোল ও ডিজেল ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত নিয়ে আসার কাজ চলছে।
গভীর সমুদ্র থেকে মহেশখালী হয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত প্রায় ২২০ কিলোমিটার পাইপ লাইন নির্মাণের বেশিরভাগ কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে।
এখন মহেশখালীতে চলছে তিনটি করে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের ট্যাঙ্ক নির্মাণ কাজ।
চীনের ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। সমুদ্রে ১৫৪ কিলোমিটার আর স্থলভাগে বসবে আরও ৭৪ কিলোমিটার ডাবল পাইপ লাইন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে জাহাজ আসবে মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে। সেখান থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে মহেশখালীতেই স্টোরেজ ট্যাংকে আনা হবে তেল। পরে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে তেল আসবে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে।
চট্টগ্রাম বন্দরে নাব্য সংকট থাকায় গভীর সমুদ্র আসে বড় জাহাজ। তারপর তা খালাস করে ছোট ছোট জাহাজে আনা হয় পরিশোধনাগারে। যা ব্যয়বহুল ও সময় সাপেক্ষ। বর্তমানে জাহাজ থেকে তেল খালাসে সময় লাগে ১২ দিন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানালেন, এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে তেল খালাসে সময় নেমে আসবে ৪৮ ঘন্টায়। সেই সঙ্গে বাঁচবে অনেক অর্থ।
এই প্রকল্প নির্মাণের ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রেও দেশ আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
সনাতন পদ্ধতিতে তেল খালাসে খরচ ও সময় বেশি লাগায় ২০১৫ সালে ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং’ বা ভাসমান জেটি নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রায় আট হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে জিটুজি ভিত্তিতে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। নতুন প্রকল্পে পাইপলাইনের মাধ্যমে মাত্র দুই দিনের মধ্যে প্রায় এক লাখ টন জ্বালানি তেল খালাস সম্ভব হবে। এতে সাগরের পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বছরে সরকারের শত শত কোটি টাকা অর্থ সাশ্রয় হবে।
