ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের আবারও পুনরুত্থানের গল্প লিখলো দেশটির সবচেয়ে প্রাচীন দল কংগ্রেস। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর একেবারে খাদের কিনারে চলে যাওয়া কংগ্রেস আবারও বিপুল বিক্রমে পূণর্জন্ম নিলো নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের হাত ধরে।
১৮তম লোকসভা নির্বাচনের সাত দফা ভোটের পর্ব শেষে বেশিলভাগ বুথ ফেরত জরিপে দাবি করা হয়েছিল একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে আবারও মসনদে বসতে চলেছে গেরুয়া শিবির। কিন্তু ভোটের ফল প্রকাশের দিন একেবারে অন্য কথা বলছে জনতার রায়। সব হিসাব-নিকাষ পাল্টে দিতে শুরু করেছে।
বিজেপি নেতৃ্ত্বাধীন এনডিএ জোটকে রীতিমতো চোখ চোখ রেখে টক্কর দিচ্ছে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোট। তারমধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কংগ্রেসের উত্থান। ২০১৪ এবং ২০১৯ সালের ব্যর্থতার পর একশ’র বেশি আসনে জয় পেতে চলেছে কংগ্রেস। অন্যদিকে ২২৭টি আসনে এগিয়ে রয়েছে ইন্ডিয়া জোট।

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর এই প্রথম কংগ্রেস একশ’র মতো আসনে জিততে চলেছে। ২০১৯ সালের নির্বাচনে ৫২টি এবং ২০১৪ সালে মাত্র ৪৪টি আসনে জয় পেয়েছিল দলটি। তার আগের নির্বাচনে ২০০৯ সালে কংগ্রেস তখন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্সের নেতৃত্বে ২০৬টি আসন জিতেছিলো।
মঙ্গলবার বিকেল চারটা পর্যন্ত কংগ্রেসের ৯৯টি আসনে জয়ের আভাস পাওয়া গেছে। তবে, কোনো কোনো গণমাধ্যমে শতাধিক আসনের কথাও বলা হচ্ছে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ৩০১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোট এগিয়ে আছে ২২৩ আসনে।
গত বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তার দল বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ তৃতীয় মেয়াদে যাতে ক্ষমতায় না আসতে পারে সেলক্ষ্যে ইন্ডিয়া জোট গঠিত হয়েছিলো। ২০১৪ ও ২০১৯ সালের নির্বাচনে মোদী ম্যাজিকে কংগ্রেস ধরাশায়ী হলে, এবারও একই রকম আভাস পাওয়া যাচ্ছিলো।

কিন্তু এবার ভোটের মাঠে নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। ১০ বছর আগে ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন দল কংগ্রেস পেয়েছিল ৪৪টি আসন। আর এর আগেরবার অর্থাৎ ২০১৯ সালের নির্বাচনে এ দলের ভাগ্যে জুটেছিল ৫২ আসন। সেই কংগ্রেস এবারের ভোটে ১০০ আসনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
বুথ ফেরত জরিপ সংস্থাগুলো সমীক্ষকেরা জানিয়েছিলেন, বিজেপি ও এনডিএ গতবারের চেয়েও ভাল ফল করে ৪০০ আসনের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, শাসক দল তার খুব কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারছে না। বরং বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ আশাতীত ভালো করছে।
এবারের ভোটে ছয়টি রাজ্য ছিলো যুদ্ধক্ষেত্র। এসব রাজ্যগুলো হলো কর্নাটক (২৮), মহারাষ্ট্র (৪৮), বিহার (৪০), উত্তর প্রদেশ (৮০), পশ্চিমবঙ্গ (৪২) ও অন্ধ্র প্রদেশ (২৫)। মঙ্গলবার ভোট গণনা শুরুর পর দেখা গেলো একমাত্র অন্ধ্র প্রদেশ ছাড়া বিজেপি ও তার শরিকেরা ততটা ভালো ফল করতে পারেনি।
এরমধ্যে সবচেয়ে নজর কেড়েছে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি উত্তরপ্রদেশ। সেখানে যোগী ম্যাজিক কার্যত ফিকে করে অধিকাংশ আসনে এগিয়ে রয়েছে কংগ্রেস। অন্যদিকে, রায়বরেলিতে রাহুল গান্ধী এগিয়ে রয়েছেন বিপুল ভোটে। কর্নাটকের ওয়ানারেও এগিয়ে তিনি। কংগ্রেসের সাফল্যের কৃতিত্ব তাঁর কাঁধেই।

উত্তর প্রদেশে বিজেপি এবার ৭০-৭৫ আসন পাবে বলে আশা করছিল, সেখানে প্রাথমিক ফলে দেখা যাচ্ছে, ইন্ডিয়া জোট ৪৩ আসনে এগিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ আসনে এগিয়ে সমাজবাদী পার্টি, সাতটি কংগ্রেস। কর্নাটকে গেলোবার একটি মাত্র আসন পেয়েছিল বিরোধীরা। এবার সেখানে কংগ্রেস ১০ আসনে এগিয়ে।
মহারাষ্ট্রে বিজেপি ও তার সহযোগী শিন্ডে শিবসেনা ও অজিত পাওয়ারের এনসিপিকে সরিয়ে জায়গা দখল করেছে উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা, শরদ পাওয়ারের এনসিপি ও কংগ্রেস। তারা এগিয়ে রয়েছে ৩০ আসনে। বিহারে এনডিএ ভালো করলেও ইন্ডিয়ার কাছে তারা পিছিয়ে রয়েছে অন্তত আট আসনে।
বিজেপি এবার প্রবল আশা করেছিল পশ্চিমবঙ্গ ঘিরে। দিদি হিসাবে খ্যাত মমতা বন্দোপধ্যায়ের ঘর তছনছ করে দেয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলো বিজেপি। গতবার তারা ৪২ আসনের মধ্যে পেয়েছিল ১৮টি। এবার বিকেল চারটার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল ৩১টি এবং বিজেপি ৯টি এগিয়ে রয়েছে।
অন্য রাজ্যেও বিজেপিকে প্রবল লড়াইয়ের মধ্যে রেখেছে কংগ্রেস। যেমন রাজস্থানে গতবার বিজেপি ২৫ আসনই জিতেছিল। এবার কংগ্রেস ১০ আসনে এগিয়ে। হরিয়ানার ১০ আসনই জিতেছিল বিজেপি। এবার কংগ্রেস সেখানে ছয়টিতে এগিয়ে। বিজেপি হিন্দি বলয়ে ভালো করছে গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে।
ভারতে সরকার গড়তে প্রয়োজন ২৭২ আসন। প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট এগিয়ে। এই চিত্র অপরিবর্তিত থাকলে নরেন্দ্র মোদীর পক্ষে তা খুব সম্মানজনক হবে না। এনডিএ ৩০১ আসনে এগিয়ে থাকলেও বিজেপি ২৪০ এর কাছাকাছি থাকবে। অর্থাৎ মোদীর ইচ্ছায় সব চলবে না।
মা সোনিয়াকে ছাপিয়ে নতুন রেকর্ড রাহুলের