হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচনে শুক্রবার দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হতে চলেছে। এ নির্বাচনে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অনুগত প্রার্থীদের আধিপত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কারণ দেশটির গার্ডিয়ান কাউন্সিল বা অভিভাবক পরিষদ এই বিষয়ে খুব কঠোর নীতিতে অবস্থান করেছে।
দেশটির অভিভাবক পরিষদ ২৮ জুনের এ নির্বাচনে পাঁচজন কট্টরপন্থি ও একজন অল্প পরিচিত মধ্যপন্থি প্রার্থীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য অনুমোদন দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আগ্রহী ৮০ জনের মধ্য থেকে এই ছয়জনকে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
কট্টরপন্থি প্রার্থীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইরানের পার্লামেন্টের বর্তমান স্পিকার ও প্রভাবশালী রেভল্যুশনারি গার্ডের সাবেক প্রধান মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এবং দেশটির হয়ে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর সঙ্গে পারমাণবিক বিষয়ক আলোচনায় প্রতিনিধিত্ব করা সাঈদ জালিলি। একমাত্র মধ্যপন্থি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মাসুদ পেজেশকিয়ান আছেন আলোচনায়।
মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ ইরানের বিপ্লবী গার্ডের সাবেক কমান্ডার এবং খামেনির মিত্র। গালিবাফ কট্টরপন্থী অধ্যুষিত পার্লামেন্টের বর্তমান স্পিকার। ৬২ বছর বয়সী কালিবাফ এর আগে দুবার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হন এবং একবার ইব্রাহিম রাইসির পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন।
সাঈদ জালিলি, একজন কট্টরপন্থী কূটনীতিক। ১৯৮০ দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধে গার্ডদের পক্ষে লড়াই করার সময় ডান পা হারিয়েছিলেন। এর আগে ২০০৭ সাল থেকে পাঁচ বছরের জন্য সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মাসুদ পেজেশকিয়ান ইরানের একমাত্র মধ্যপন্থি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী তিনি। ৭০ বছর বয়সী এই চিকিৎসক পাঁচবার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একমাত্র মধ্যপন্থী প্রার্থী মাসুদ পেজেশকিয়ান ইরানের রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা সংস্কারবাদী শিবিরের সমর্থন পেয়েছেন। এই সংস্কারবাদী শিবির পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বৈরিতার অবসানের পক্ষে কথা বলে।
আলোচনায় না থাকলেও নিজেদের মত প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন বাকি তিন প্রার্থি । এদের মধ্যে মোস্তফা পুর মোহাম্মদী, ছয় জন প্রার্থীর মধ্যে গার্ডিয়ান কাউন্সিল অনুমোদিত একমাত্র ধর্মগুরু মোস্তফা পুরমোহাম্মদী। ২০০৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের প্রথম মেয়াদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
আরো আছেন আলী রেজা জাকানি, তিন বছর ধরে তেহরানের কট্টরপন্থী মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এর আগে সাবেক এই আইন প্রণেতাকে ২০১৩ ও ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
আরেক প্রার্থী হলেন আমির হোসেন গাজিজাদেহ-হাশেমী, যিনি বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং শহিদ উন্ডেশনের প্রধান গাজিজাদেহ-হাশেমি একজন কট্টরপন্থী রাজনীতিবিদ। ২০২১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হারেন তিনি।
এদিকে, নানা জরিপে দেখা গেছে, জনপ্রিয়তার দৌড়ে এগিয়ে আছেন মোহাম্মাদ বাকের কালিবাফ, মাসুদ পেজেশকিয়ান ও সাইয়েদ জলিলি। তবে প্রচারে পিছিয়ে নেই বাকি তিন প্রার্থী আমির হাশেমি, আলি রেজা জাকানি এবং মোস্তফা পোরমোহাম্মদি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি এ নির্বাচনে প্রকাশ্যে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেননি। কিন্তু মঙ্গলবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে কট্টর পশ্চিমাবিরোধী খামেনি বলেছেন, যিনি মনে করেন আমেরিকার আনুকূল্য ছাড়া কিছুই করা সম্ভব নয়, তিনি এই দেশকে সামলাতে পারবেন না।
তাঁর উপদেষ্টা ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি ভোটারদের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেছেন, এমন এক প্রেসিডেন্টকে নির্বাচিত করুন, যার মতামত সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না। জনগণের উচিৎ এমন একজনকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নেয়া, যিনি নিজেকে সেকেন্ড ইন কমান্ড মনে করবেন। প্রেসিডেন্টের উচিৎ হবে না বিভেদ সৃষ্টি করা।
গত ১৯ মে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আব্দুল্লাহিয়ানসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর এই নির্বাচনের প্রক্রিয় শুরু হয়।
ইরানের সংবিধানের ১৩১ ও ১৩২ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো প্রেসিডেন্ট মৃত্যুবরণ করলে অথবা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে সর্বোচ্চ ৫০ দিনের মধ্যে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে হবে। সেই অনুযায়ী ১২ জুন থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়ে ২৭ জুন পর্যন্ত চলবে।
২৮ জুন শুক্রবার ইরানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কে হতে যাচ্ছেন ইব্রাহীম রাইস্যার উত্তরসরী। আলোচনায় থাকা বাকের কালিবাফ, সাইদ জালিলি, মাসুদ পেজেশকিয়ান নাকি প্রাচারের আলোয় না থাকা অন্য কেও হবেন ইরানের কাণ্ডারি?
