নানা সময়ে বিভিন্ন কারণে আলোচনায় আসা হেলেনা জাহাঙ্গীরকে বৃহস্পতিবার রাতে গুলশানের নিজ বাসা থেকে আটক করে র্যাব। কখনও ব্যবসায়ী আবার কখনও রাজনীতিবিদ হিসেবে আলোচনা-সমালোচনায় আসেন এই নারী।
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার সদর উত্তর ইউনিয়নের কদমতলী গ্রামের ক্যাপ্টেন আব্দুল হক শরীফের মেয়ে হেলেনা আক্তার। ১৯৭৪ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার তেজগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।

বাবার চাকরির সুবাদে হেলেনা জাহাঙ্গীরের বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামের হালিশহরের মাদারবাড়ী, সদরঘাট এলাকায়। পড়াশোনা স্থানীয় কৃষ্ণচূড়া স্কুলে। চাকরি সূত্রে তার বাবা রাশিয়ায় চলে গেলে মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়ি ফিরে যান হেলেনা।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৯৯০ সালে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি ইউনিয়নের চাঁদসার গ্রামের গার্মেন্টস ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর কবিরকে বিয়ে করলে নামের সঙ্গে যুক্ত হয় জাহাঙ্গীর। তিনি তিন সন্তানের জননী।

হেলেনা স্বামীর ব্যবসা দেখার পাশাপাশি নিজেও হয়ে উঠেন একজন নারী উদ্যোক্তা। অনেক নারী সংগঠন ‘ইনার হুইল ক্লাব’-এর সদস্য হয়ে সখ্যতা গড়ে তোলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে।
বিয়ের ছয় বছর পর ১৯৯৬ সালে রাজধানীর মিরপুর এগারোর একটি ভবনের দুই ফ্লোর নিয়ে হেলেনা শুরু করেন প্রিন্টিং ও এমব্রয়ডারি ব্যবসা।

নিট কনসার্ন প্রিন্টিং ইউনিট লিমিটেড দিয়ে শুরু করে ‘জয়যাত্রা গ্রুপের’ আওতায় একে একে তিনি গড়ে তোলেন জয় অটো গার্মেন্টস লিমিটেড, আইপি টেলিভিশন জয়যাত্রা, জেসি এমব্রয়ডারি অ্যান্ড প্রিন্টিং এবং হুমায়রা স্টিকার লিমিটেড। সবকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ব্যবসায়ী নেতা মরহুম আনিসুল হকের সাথে কাজ করে আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য বনে যান হেলেনা। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বাগিয়ে নেন কেন্দ্রীয় ও জেলা আওয়ামী লীগে পদ-পদবী।

কুমিল্লা-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল মতিন খসরুর মৃত্যুতে আসনটি খালি হওয়ায় স্বামীর ঠিকানায় ওই আসন থেকে সংসদ নির্বাচন করার জন্য আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্রও সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। যদিও স্বামী জাহাঙ্গীর কবির কোন রাজনীতি সংগঠনের সাথে যুক্ত নন।
হেলেনা জাহাঙ্গীর ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সদস্য। এছাড়া পোশাক শিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র সাথে সংশ্লিষ্টতা ছিল তার।
আওয়ামী লীগের মহিলা-বিষয়ক উপকমিটির সদস্য ছিলেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। সাম্প্রতিক ঘটনার পর তাকে ওই কমিটি থেকে বাদ দেয়া হয়।

কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগেরও উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েকটি বিদেশযাত্রার সফরসঙ্গীও হয়েছিলেন তিনি। তার ফেসবুকে ২০ লাখের বেশি ফলোয়ার।
প্রিন্টিং, অ্যামব্রয়ডারি, প্যাকেজিং, স্টিকার এবং ওভেন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে। জয়যাত্রা গ্রুপের আওতায় এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। সব মিলিয়ে ১২ হাজার কর্মী কাজ করছেন তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

বর্তমানে আওয়ামী রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হলেও এর আগে জাতীয় পার্টি ও বিএনপির রাজনীতিতে সংশ্লিষ্টতার খবর পাওয়া যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দুটি দলের প্রধান খালেদা জিয়া ও হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের সঙ্গে হেলেনা জাহাঙ্গীরের ছবি প্রকাশ পেয়েছে।
.jpg)
ছবি দুইটি সম্পর্কে হেলেনা জাহাঙ্গীর বলেন, ২০০০ সালে বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের ছেলের বিয়েতে ‘ইনার হুইল ক্লাব’ কে দাওয়াত করেছিলেন। সেই বিয়ের দাওয়াতে অতিথি হিসেবে গিয়ে ওই ছবি তোলা হয়েছিল। অপরদিকে ২০১৬ সালের নভেম্বরে আমার ছেলের বিয়েতে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ অতিথি হিসেবে আসার পর ছবি তুলি। তখন আমি কোন রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলাম না’।

তিনি আরও বলেন, ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপরোশন নির্বাচনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ দলীয় মেয়র-প্রার্থী আনিসুল হকের সাথে কাজ করে আওয়ামী লীগের সাথে পথচলা শুরু করি। ২০১৯ সালে আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য এবং ২০২০ সালে কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির উপদেষ্টা হই।
.jpg)
জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের নামে গত ২০১৮ সাল থেকে ২৫ জন বৃদ্ধকে মাসিক এক হাজার টাকা করে ভাতা দিতেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। প্রায় দেড় বছর তা পরিচালনা করার পর সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। তবুও চলছে ‘জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন’ নামে সংগঠন।
একাত্তর/আরএ/এসি
