এ যেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার মতোই- শেষ হইয়াও যেন হইলো না শেষ। বড়ই শখ ছিলো, দেশের মাটিতে শেষ ম্যাচটি খেলে তারপর অবসরে যাবেন। বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম নন্দিত-নিন্দিত তারকা সাকিব আল হাসান। তার সেই শখ পূরণের সব আয়োজনই শেষ করে এনেছিলো বিসিবি।
সাকিবকে রেখেই, মিরপুর শেরে-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে জন্য ১৫ জনের দল ঘোষণা করা হয়। এটাও জানা যায়, জীবনের শেষ টেস্ট ম্যাচটি খেলতে বৃহস্পতিবার রাতে বা শুক্রবার ভোরে দুবাই থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে পারেন এক সময়ের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব।
মিরপুরের ২২ গজে সাকিবের শেষটা দেখার অপেক্ষায় যখন ক্রিকেট বিশ্ব, তখনই হাজির জটিলতার নতুন সমীকরণ। বৃহস্পতিবার সকালেই খবর এলো, দুবাই থেকে ঢাকায় আসছেন না সাকিব। নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার ও বিসিবির লাল সংকেতে ঢাকা ফেরা হচ্ছে না সাকিবের।

মিরপুর স্টেডিয়াম সংলগ্ন এলাকায় গেলো কয়েকদিনের বিক্ষোভের কারণে সাকিব আল হাসানের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয় সরকারকে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট স্কোয়াড থেকে সাকিবের নাম বাদ না দিলে ‘মিরপুর ব্লকেড’ করা হবে বলে হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলো বিক্ষোভকারীরা।
এই পরিস্থিতিতে সাকিবের দেশে ফেরা নিয়ে তৈরি হয় নানান জটিলতা। দুবাইয়ের স্থানীয় সময় বিকেল ৫টার একটি ফ্লাইটে দেশের ফেরার কথা ছিলো বাঁহাতি অলরাউন্ডারের। উদ্ভূত পরিস্থিতি ও নিরাপত্তাজনিত কারণে সাকিবকে দেশে আসতে নিষেধ করেছে বিসিবির। বোর্ডের পরামর্শে ফ্লাইট বাতিল করেছেন সাকিব।

তবে সাকিবের না আসার খবরেও শান্ত হননি বিক্ষুব্ধ জনতা। বৃহস্পতিবার দুপুর দু’টা নাগাদ সাকিব ইস্যুতে মিরপুর ক্রিকেট স্টেডিয়ামের বাইরে ছিলো থমথমে অবস্থা। সাকিববিরোধীদের স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠে স্টেডিয়ামের আশপাশ। এ সময় বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিল আন্দোলনকারী জনতা।
স্টেডিয়ামের আশপাশের দেয়ালে নানা স্লোগান লিখেছেন তারা। এঁকেছেন গ্রাফিতিও। অন্যদিকে, পুলিশের কড়া নিরাপত্তার মাঝেই স্টেডিয়ামের ভেতরে অনুশীলন চালিয়ে গেছেন দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেটাররা। কিছু এলাকায় যান চলাচল নিষিদ্ধ করে দেয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা।
দুবাইতে সাকিব নিজেই জানিয়েছেন, পরিস্থিতি যা তাতে তার দেশে ফেরা হচ্ছে না। শুধু মাঠেই নয়, নিজ দেশেই আপাতত আর ফিরছেন না তিনি।

আফ্রিকার বিপক্ষে সাকিবের দুই টেস্টের একটিতেও খেলা হচ্ছে না। ফলে নাটকীয় কোন কিছু না হলে সাকিবের শেষ টেস্ট ম্যাচটা কানপুরেই হয়ে থাকছে।
সাকিবের পারিবারিক সূত্রও জানিয়েছে, নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলে ওর দেশে না ফেরাই ভালো। যদি গ্রেফতার হতে হয় তাহলে দেশে কেন ফিরবে। একই বার্তা পরিবার থেকেও সাকিবকে দেয়া হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে পারেন সাকিব। তবে সেই ফ্লাইট পেতে বেশ কিছু দিন দুবাই থাকতে হবে তাকে।
সাকিবের বিদায়ী টেস্টকে কেন্দ্র করে পরিবারের উদ্যোগে এক হাজার টি শার্ট তৈরি করা হয়েছিল সমর্থকদের জন্য। এছাড়া ব্যানারও তৈরি করা হচ্ছিল। সাকিব যদি শেষ পর্যন্ত নাই আসেন, তাহলে সব আয়োজন বাতিল করে দেবে বলে পারিবারিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

খেলার পাশাপাশি সাকিব আল হাসান জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হিসেবে মাগুরা-১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সাকিবের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে।
ভারত সফরে কানপুর টেস্টের আগে অবসর ঘোষণা দেন সাকিব। নিরাপত্তা পেলে ও দেশের বাইরে যাওয়ার নিশ্চয়তা পেলে মিরপুরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে শেষ টেস্ট খেলার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। সেই অনুযায়ী সব ব্যবস্থাও করেছিলো বিসিবি। কিন্তু জনরোষের কারণে সেটি আর সম্ভব হচ্ছে না।
দীর্ঘ সময় টাইগার ক্রিকেটের দূত হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি পেলেও সাকিব আল হাসানকে ঘিরে বিতর্ক কখনই পেছন ছাড়েনি। মাঠের মধ্যে মেজাজ হারানো, অসদাচরণের পাশাপাশি গ্যালারির দর্শকদের প্রতি কুৎসিত আচরণ, জুয়া বিতর্ক, ব্যবসা ও টাকার লোভ থেকে শুরু করে নানা অপকর্মের কুৎসা সব সময়ই ছিলো।
তবে, এতো কিছুর পরও সাকিবের ছিলো বিশাল ভক্তকুল। সাকিবের নাম লেখা জার্সির ছিলো বেশ চাহিদা। এমনকি তাকে আইডল মনে করে অনেক শিশু-কিশোরই বড় হয়ে তার মতো ক্রিকেটার হতে চাইতেন। কিন্তু প্রকৃতির কী নির্মম পরিহাস, সেই ভক্তরাই রাজপথে এখন সাকিবের ক্যারিয়ারই শেষ করে দিলেন।
সাকিবকে টেস্ট দলে রাখার পর বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একদল তার কুশপুত্তলিকা দাহ করে। ধারণা করা যাচ্ছ এরপর থেকে ঘটনার মোড় ঘুরে যেতে পারে। পরের দিন বৃহস্পতিবার মিরপুর স্টেডিয়ামের চারপাশে চলে মিছিল। সেখান থেকে একটি দল বিসিবি প্রতিনিধির কাছে স্মারকলিপিও দেয়।
বিক্ষোভে অংশ নেন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত জুলফিকার আহমেদ শাকিলের বন্ধুবান্ধব ও সহপাঠীরা। আমাদের পাঠশালায় স্কুল জীবন কেটেছে শহীদ শাকিলের। সেই স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা সাকিব আল হাসানকে জাতীয় দল থেকে বাদ দেয়ার দাবি নিয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন কর্মসূচিতে।
শহীদ শাকিলের ছবি সম্বলিত ব্যানারসহ মিছিল নিয়ে এসেছিলেন তারা। আমাদের পাঠশালার সাবেক এবং বর্তমান শিক্ষার্থী বলেছেন, শহীদ শাকিলের লাশের ওপর দিয়ে মিরপুরে স্টেডিয়ামে সাকিব আল হাসানকে খেলতে দেওয়া হবে না। দেয়ালেও তারা বিভিন্ন প্রতিবাদী স্লোগান লেখেন।
ফিরবেন না সাকিব, খেলবেন না বিদায়ী টেস্ট