আলো-অন্ধকারের দার্শনিক জহির রায়হান

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৫, ০৫:২৮ পিএম

কালের মহাসাগরে ভাসমান মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু নাম আলোকস্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে থাকে, যারা শুধু নিজের সময়কেই আলোকিত করেন না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথও প্রজ্বলিত রাখেন। এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র জহির রায়হান। 

জন্মেছিলেন ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার মিঠাখালি। তখন ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটতে চলেছে, কিন্তু বাংলার আকাশে জমে উঠছে বিভাজনের কালো মেঘ। সমাজে দারিদ্র্য, অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা—সেই অন্ধকার যুগেই জন্ম নিলেন তিনি, যিনি পরবর্তীতে আলো হয়ে উঠলেন বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে। 

শৈশব কেটেছে তার গ্রামীণ বাংলার রূপময় প্রকৃতির কোলে, যেখানে নদীর কলতান, মাটির গন্ধ এবং মানুষের সহজ-সরল জীবনধারা তার মনে গেঁথে গিয়েছিল চিরকালের জন্য।পড়াশোনা করেছেন মিত্র ইনস্টিটিউশন, আলিয়া মাদ্রাসা, কলকাতা মহানগর কলেজে, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। সময়ের পরিক্রমায় কলকাতা এবং পরে ঢাকার শিক্ষাজীবন তাকে আধুনিকতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, তৈরি করে এক অনন্য শিল্পীসত্তা যেখানে গ্রাম্য জীবনবোধ এবং নাগরিক সংস্কৃতি একাকার হয়ে গিয়েছে। তার লেখনীতে এই দ্বৈত সত্তার পরিচয় মেলে বারবার - একদিকে যেমন আছে বাংলার মাটির গভীর টান, অন্যদিকে তেমনি আছে শহুরে জীবনের জটিলতা ও নাগরিক সংকট।

তার সাহিত্যিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ছোটগল্প দিয়ে। প্রথম গল্প 'ছোট্ট একটি ঘটনা' (১৯৫১) প্রকাশিত হওয়ার পরপরই তিনি পাঠকের নজর কাড়েন। এরই মধ্যে বাংলা সাহিত্য জগতে শুরু হয়েছে আধুনিকতাবাদী ও সমাজমনস্ক লেখালেখির ঢেউ। শওকত ওসমান, আবুল ফজল কিংবা শহীদুল্লাহ কায়সারদের মতো লেখকের পাশে দাঁড়িয়ে জহির রায়হান গড়ে তুললেন নিজস্ব ভাষা—যেখানে বাস্তবতা ও রোমান্টিকতা একীভূত হয়ে তৈরি করে নতুন এক ধারা। সুরঙ্গ (১৯৬০) গল্পগ্রন্থের প্রতিটি গল্প যেন একেকটি জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিসরে বড় সত্যের আবিষ্কার। শহুরে জীবনের নিঃসঙ্গতা, মধ্যবিত্তের সংকট, নারীর আত্মানুসন্ধান - এসব বিষয় তিনি এমন নিপুণভাবে উপস্থাপন করেছেন যে প্রতিটি গল্প পাঠককে নাড়া দেয় গভীরভাবে। তাঁর গল্পের ভাষা কখনো কাব্যিক, কখনো বাস্তবনিষ্ঠ, কিন্তু সর্বদাই স্পর্শকাতর এবং শিল্পিত। প্রতিটি বাক্য যেন একেকটি তুলির আঁচড়, মিলে মিশে তৈরি করে এক পরিপূর্ণ চিত্রকল্প।

জহির রায়হান উপন্যাসের বিশালতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এক অনন্য শিল্পীসত্তা নিয়ে। 'হাজার বছর ধরে' উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক, যেখানে গ্রামীণ জীবনের রূপান্তর, নারীর অন্তর্লীন সংগ্রাম এবং সমাজের পরিবর্তনশীল গতিধারা এক অপূর্ব শিল্পসুষমায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। এই উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র যেন বাংলার মাটির গভীর থেকে উঠে আসা জীবন্ত প্রতিমূর্তি - তাদের হাসি-কান্না, আশা-নিরাশা, জয়-পরাজয় আমাদের নিজেদেরই জীবনের কথা বলে। তাঁর 'আরেক ফাল্গুন' উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালের উত্তাল সময়কে ধরেছেন এমন এক শিল্পসৌকর্যে, যেখানে ব্যক্তিগত টানাপোড়েন এবং জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা একাকার হয়ে গিয়েছে। 'শেষ বিকেলের মেয়ে' নারীর জীবনের ভেতরকার অন্তর্লীন ব্যথা ও আত্মত্যাগকে কাব্যিক ভঙ্গিতে প্রকাশ করেছে। আর 'বরফ গলা নদী' উপন্যাসে প্রেমের যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, তা বাংলা সাহিত্যে এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে - যেখানে ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়, বরং এক গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান। সেই সময়ে বাংলা উপন্যাসে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও সেলিনা হোসেনরা যেমন সামাজিক ইতিহাসের জটিলতায় প্রবেশ করছিলেন, তেমনি জহির রায়হানও ইতিহাসকে মানুষের অন্তর্গত রূপের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন অসাধারণ মুন্সিয়ানায়। তার প্রতিটি লেখা যেনো সময়ের সঙ্গে গভীর আলাপচারিতা, যেখানে ব্যক্তিগত প্রেম যেমন আছে, তেমনি জাতির ইতিহাসেরও প্রতিফলন ঘটে।

তাঁর শিল্পীসত্তার পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছিল চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন সেই বিরল প্রতিভা যিনি শব্দ এবং ছবির মেলবন্ধনে নতুন এক শিল্পভাষা সৃষ্টি করেছিলেন। প্রথমে চিত্রনাট্যকার, পরে পরিচালক হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৬১ সালে 'কখনো আসেনি' ছবির মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর পরিচালনা জীবন। এর পরের বছরেই 'কাচের দেয়াল'। এরপর তিনি নির্মাণ করেন সংসার (১৯৬৪), বাহানা (১৯৬৫), আনোয়ারা (১৯৬৭), বেহুলা (১৯৬৬)—যেখানে বাঙালির লোককাহিনি ও সংস্কৃতিকে আধুনিক চলচ্চিত্রভাষায় রূপ দেন। তাঁর চলচ্চিত্রচর্চার সময়কাল ছিল বাংলা সিনেমার এক সন্ধিক্ষণ। পাকিস্তানি সেন্সরশিপের কষাঘাতে চলচ্চিত্রে বাংলা জাতিসত্তা চর্চা ছিল কঠিন; কিন্তু সত্তরের দশকের শুরুতে জহির রায়হান চলচ্চিত্রকে সরাসরি জাতীয় সংগ্রামের হাতিয়ার বানালেন। জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০) চলচ্চিত্রটি তাঁর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কীর্তি, যেখানে পারিবারিক স্বৈরাচারের রূপক দিয়ে তিনি পাকিস্তানি সামরিক শাসনের চেহারা প্রকাশ করেন। দর্শকরা বুঝেছিল, এ কেবল একটি গল্প নয়, এ মুক্তির ডাক। 

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নির্মাণ করেছিলেন 'স্টপ জেনোসাইড' প্রামাণ্যচিত্র, যা বাংলাদেশের গণহত্যার চিত্রকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরে বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিল।

তাঁর শিল্পচর্চার মূলে ছিল এক গভীর দার্শনিক ভিত্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন শিল্প শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি সামাজিক পরিবর্তনেরও হাতিয়ার। তার সৃষ্টিকর্মে বারবার ফিরে এসেছে স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন। তিনি শিল্পের মাধ্যমে সমাজকে প্রশ্ন করতে চেয়েছেন, মানুষকে জাগাতে চেয়েছেন, পরিবর্তনের ডাক দিতে চেয়েছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলেরই উত্তরসূরি, যারা শিল্পকে মানুষের মুক্তির পথ হিসেবে দেখতেন।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সাংস্কৃতিক জাগরণে জহির রায়হান হয়ে উঠেছিলেন অনন্য এক কণ্ঠস্বর। স্বাধীনতা অর্জনের পর যখন পুরো জাতি নতুন পরিচয় খুঁজছিল, তখন তিনি তার সৃজনশীলতা দিয়ে সেই জাতীয় চেতনা নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারতেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে সেই সম্ভাবনা অপূর্ণ রয়ে যায়। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলগ্নেই জহির রায়হান নিখোঁজ হন। তার এই অকালপ্রয়াণ শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, গোটা জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি যদি বেঁচে থাকতেন, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগত হয়তো আজ আরও সমৃদ্ধ হতো। কিন্তু তার রেখে যাওয়া সাহিত্য ও চলচ্চিত্র আমাদের জন্য অমূল্য সম্পদ। আজ যখন আমরা তার 'হাজার বছর ধরে' পড়ি বা 'জীবন থেকে নেয়া' দেখি, তখন আমরা শুধু শিল্পের সৌন্দর্যই উপভোগ করি না, আমাদের নিজেদের ইতিহাস ও সংগ্রামকেও নতুনভাবে আবিষ্কার করি।

তিনি বিশ্বাস করতেন যে, শিল্পী শুধু সমাজের দর্পণ নন বরং তিনি সমাজের বিবেকও। তার জীবন ও কর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শিল্পের শক্তি কতোটা গভীর হতে পারে - এটি শুধু হৃদয়কে স্পর্শ করে না, বিবেককেও জাগ্রত করে। আজ যখন আমরা তার সৃষ্টিকর্মের আলোকে নিজেদের জীবনকে বিচার করি, তখন আমরা এক নতুন দিগন্তের সন্ধান পাই। কারণ জহির রায়হানের মতো মহৎ শিল্পীরা কখনো মারা যান না।  তারা বেঁচে থাকেন অনন্তকাল, তাদের সৃষ্টির মাধ্যমে- মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্টার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, [email protected]

একাত্তর/এসি
শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হলো গভীর শোকে। ভারতের কলকাতার একটি জনপ্রিয় পূজামণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড় ও বৃষ্টির জেরে সৃষ্ট পদদলনে ঘটনায় অন্তত ১৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত...
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী পাটোয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন এলাকায় কাঠের তৈরি তিনতলা টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁয় সংঘটিত ভয়াবহ আগুনে ১০ জন পর্যটকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর সব তথ্য সামনে এসেছে।...
সৌদি আরবের বিমানবন্দরে আকস্মিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে শুরু হয়েছে চরম চাঞ্চল্য ও অস্থিরতা! পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে রিয়াদগামী নিজেদের সব উড্ডয়ন বা ফ্লাইট এক ধাক্কায় অনির্দিষ্টকালের...
সুদূর চীনের হেনান শহর থেকে সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে সোজা বাংলাদেশের মাদারীপুর সদর উপজেলার চাপাতলী গ্রামে হাজির হয়েছেন ওয়াং এরলিং নামের এক চীনা যুবক। উদ্দেশ্য একটাই, মন দেয়া-নেয়া হওয়া মাদারীপুরের...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর