ভাষার দেয়াল আলাদা, সংস্কৃতিতে আকাশ-পাতাল তফাত, দেশও পৃথিবীর দুই ভিন্ন প্রান্তে! কিন্তু ভালোবাসার টান যে কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা ভাষার বাঁধন মানে না, তা আরও একবার প্রমাণ করল এক রোমাঞ্চকর প্রেমের গল্প।
সুদূর চীনের হেনান শহর থেকে সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে সোজা বাংলাদেশের মাদারীপুর সদর উপজেলার চাপাতলী গ্রামে হাজির হয়েছেন ওয়াং এরলিং নামের এক চীনা যুবক। উদ্দেশ্য একটাই, মন দেয়া-নেয়া হওয়া মাদারীপুরের মিষ্টি মেয়ে হাফিজা আক্তারকে জীবনের চিরতরে আপন করে নেয়া!

সব কিছু শুরু হয়েছিল চীনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ওয়ার্ল্ড টক’ অ্যাপের চ্যাটবক্সে। সেখানেই প্রথম পরিচয় হাফিজা আক্তার ও ওয়াং এরলিংয়ের। টেক্সট বিনিময় আর হাই-হ্যালো থেকে গল্প গড়ায় গভীর বন্ধুত্বে, আর সেই বন্ধুত্ব রূপ নেয় নিবিড় প্রেমে। শুধু ডিজিটাল ভালোবাসাতেই থেমে থাকেননি দুজনে; দুই পরিবারের সঙ্গেই ভালোবাসার গল্প শেয়ার করে আদায় করে নেন বিয়ের সম্মতিও।
প্রেমিকাকে জীবনসঙ্গী করতে শেষ পর্যন্ত সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে গত ১৫ অক্টোবর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পা রাখেন ওয়াং এরলিং। বিমানবন্দর থেকে হাফিজার পরিবারের সদস্যরা পরম আদরে হবু জামাইকে নিয়ে আসেন মাদারীপুরের গ্রামের বাড়িতে।

আর সুদূর চীন দেশ থেকে ‘বিদেশি জামাই’ আসার খবর চাউর হতেই পুরো চাপাতলী গ্রামজুড়ে শুরু হয় তুমুল শোরগোল! ভিনদেশি এই প্রেমিককে একনজর দেখতে, তার সঙ্গে ছবি তুলতে কিংবা রূপকথার মতো এই প্রেমের গল্প শুনতে হাফিজাদের বাড়িতে এখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উৎসুক কৌতূহলী মানুষের ঢল নামছে।
প্রেমের বাঁধন যতই শক্ত হোক, বাস্তবতার নানা হিসেব-নিকেশও কিন্তু বাদ যাচ্ছে না। গ্রামের মুরুব্বি ও প্রতিবেশীদের অনেকে বলছেন, প্রেম-ভালোবাসা তো ঠিক আছে, তবে সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধ মানাটা জরুরি। হাফিজার মা বিউটি বেগম মুচকি হেসে জানান, মেয়ের সুখই তো আসল, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে কাগজপত্র ও আইনি আনুষ্ঠানিকতা পুরোপুরি সুনিশ্চিত করতে চান তাঁরা।

হাফিজাও স্পষ্ট জানিয়েছেন, পারস্পরিক গভীর আস্থা ও ভালোবাসার জায়গা থেকেই তাদের এই পথচলা, তবে আইনি সব বিষয় মেনেই শুভকাজ সম্পন্ন হবে। অন্যদিকে প্রেমে একধাপ এগিয়ে থাকা প্রেমিক ওয়াং এরলিং বেশ আনন্দের সঙ্গেই জানিয়েছেন, হাফিজাকে পাওয়ার জন্য তিনি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ও সানন্দে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে প্রস্তুত!
বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে মাদারীপুর সদর থানা-পুলিশ হাফিজাদের বাড়িতে গিয়ে ভিনদেশি অতিথির খোঁজখবর নেয় এবং তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার ও স্থানীয়দের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়। সব মিলিয়ে এখন মাদারীপুরের সেই দূর গাঁয়ে বইছে ভিনদেশি হাওয়া আর প্রেমের সুবাস!
