‘তিন বার ভাঙনে ঘর গেছে। আগে নদী ছিলো বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে, এখন ঘরের বারান্দায়। কোথায় যাবো, কে জায়গা দেবে? ছয় সন্তান এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ আবার সরকারি জায়গায় অস্থায়ীভাবে ছাপড়া তুলে জীবনযাপন করছে।’- কথাগুলো বলছিলেন লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার চরগাজী ইউনিয়নের বয়ারচরের বাসিন্দা ৭০ বছরের বৃদ্ধ সাইফুল ইসলাম।
শুধু সাইফুল নন, একই দুর্দশার কথা গ্রামের প্রবীণ আব্দুল খালেকের মুখেও। জানান, আমি ৪০ বছর ধরে এই চরে আছি। চার বার নদী আমার ঘর নিয়ে গেছে। এখন তিন নাম্বার চরে বাস করছি। এবার ভাঙলে কোথায় যাবো জানি না।

জনপদটি মেঘনা নদীর লাগাতার ভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হতে চলেছে। একের পর এক ভাঙনে ওই এলাকার অর্ধশতাধিক পরিবার বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে এখন আশ্রয় নিয়েছে খোলা আকাশের নিচে। নদী তীরের অন্য পরিবারগুলোও দিন কাটাচ্ছে ভাঙন আতঙ্কে।
সরেজমিন, এক সময় প্রায় তিন লাখ মানুষে মুখরিত ছিলো এই জনপদ। এখন সেখানে শুধু মেঘনার টেউয়ের গর্জন, আর ভিটেমাটি হারা মানুষের হাহাকার। চার দশক আগেও যেখানে ছিলো সবুজ মাঠ, স্কুল, মসজিদ, কবরস্থান, আজ তার সবকিছুই নদী গর্ভে।
স্থানীয়রা জানান, দুই দশক আগে নদী রক্ষায় নির্মিত বেড়িবাঁধ কিছুটা স্বস্তি দিলেও তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। নির্মাণের পর বর্ষা পার না হতেই বাঁধটি ভাঙনের মুখে পড়ে। এখন অল্প কিছু জমি আর অসহায় কয়েকটি পরিবার টিকে আছে।

তারা জানান, এ বছরের বর্ষায় রামগতি ব্রিজ ঘাট থেকে চেয়ারম্যান ঘাট পর্যন্ত বেড়িবাঁধের একাধিক অংশ ভেঙে যায়। স্লুইচগার্ড এলাকার বাঁধ ভেঙে দুই শতাধিক ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ ফেলেছে।
তাদের আশঙ্কা, আগামী বর্ষার আগেই যদি স্থায়ী কংক্রিট ব্লক না ফেলা হয়, তাহলে বাকি অংশও নদীতে মিশে যাবে।
৩০ বছরের যুবক রফিকুল ইসলাম বলেন, বয়ারচরে এখন প্রতিদিন জোয়ার আসে, আবার নামে। রাস্তাঘাট, স্কুল, মাদ্রাসা সব নদীর গর্ভে চলে যাচ্ছে। মনে হয় নদী আমাদের গ্রাম গিলে ফেলছে। চরবাসীর দাবি, বয়ারচর রক্ষায় দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হোক।
স্থানীয় চর গাজী ইউপির সদস্য দিদার বলেন, বর্ষার আগেই টেকসই বাঁধ নির্মাণ না হলে রামগতি উপজেলার মানচিত্র পাল্টে যাবে।
তিনি জানান, সম্প্রতি স্থানীয়রা ‘নদী ভাঙন ঠেকাও, চরগাজী ইউনিয়ন বাঁচাও’ দাবিতে মানববন্ধন করেছেন। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন ও পাউবো অনেকবার জানিয়েও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

লক্ষ্মীপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ উজ্জামান খান বলেন, বয়ারচরে মেঘনার ভাঙন নতুন নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরে চলমান। ভাঙন রোধে বিভিন্ন সময়ে পাউবো অস্থায়ীভাবে কাজ করেছে। তবে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে ‘সবুজ পাতা প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্পে রামগতির বয়ারচরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদী সংরক্ষণ কাজ করা হবে। গত বৃহস্পতিবার প্রকল্পটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুত অনুমোদন পেলে কাজ শুরু করা যাবে।
এদিকে লক্ষ্মীপুর সদরের চররমনী মোহন ও রায়পুরের অংশে ডিপিপি প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
