২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনে জেন-জি বা তরুণ ভোটারদের অগ্রাধিকারের শীর্ষে রয়েছে কর্মসংস্থান, সুশাসন এবং নির্ভয়ে কথা বলার স্বাধীনতা। বুধবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।
২০০৯ সালের পর বৃহস্পতিবারের এই ভোটকে দেশটির প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। যদিও নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন স্থগিত করায় হাসিনার দল আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক এই দেশটির প্রধান শিল্পগুলো মাসব্যাপী অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২০২২ সালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ তরুণ, যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে (জেন-জি)। ২০২৪ সালে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালনের পর, এই তরুণরা বিপুল সংখ্যায় ভোট দেবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং একটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে তাদের পছন্দই জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে দিতে পারে।
তবে অনেকের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বড় কোনো সংস্কার হয়নি এবং কোনো শক্তিশালী বিকল্প রাজনৈতিক দলও গড়ে ওঠেনি। ফলে ক্ষমতার লড়াই মূলত প্রধান দুই প্রতিষ্ঠিত দল- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
২০ বছর বয়সী ফারহান সাদিক বলেন, এই নির্বাচন জুলাই (২০২৪) আন্দোলনের ফসল। প্রার্থীরা যদি মনে করেন তারা পুরনো কায়দায় রাজনীতি করবেন, তবে তা আর কাজ করবে না।

২০২৪ সালের অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেয়া একটি যুব-নির্ভর দল জামায়াতের সাথে জোটে যোগ দিলেও বেশিভাগ বিশ্লেষক মনে করছেন বিএনপিই জয়ী হতে যাচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শাকিল আহমেদ বলেন, তরুণ ভোটাররা নতুন একটি রাজনৈতিক নেতৃত্ব খুঁজছে। তিনি আরও বলেন, যেহেতু নতুন গঠিত দলটি কোনো বিস্তৃত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম দিতে পারেনি, তাই বিএনপিই তরুণদের পছন্দের তালিকায় এগিয়ে থাকতে পারে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ শাহান মনে করেন, জেন-জি ভোটারদের একটি বড় অংশ জামায়াতকে সমর্থন করতে পারে। তিনি বলেন, এটি হয়তো জয়-পরাজয় নির্ধারণী হবে না, তবে জামায়াতকে নিশ্চিতভাবেই একটি বড় শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে।
চাকরি, স্বাধীনতা এবং আইন-শৃঙ্খলা
রয়টার্সের সাথে আলাপকালে জেন-জি ভোটাররা জানান, তাদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা। বগুড়ার ২৪ বছর বয়সী মনিকা আক্তার, যিনি প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন, বলেন, আমি আশা করি নতুন সরকার আমার মতো তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের সমস্যা বুঝবে। আমাদের একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিয়োগ ও পরীক্ষা পদ্ধতি প্রয়োজন। বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আমরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছি।
২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান যোগ করেন, "জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৮৬% শিক্ষার্থী বেকার—এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমরা পড়াশোনা শেষ করে বেকার থাকতে চাই না। আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা প্রয়োজন যাতে আমরা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারি।" উল্লেখ্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান যা সারা দেশে ২,২০০-এরও বেশি কলেজ পরিচালনা করে।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা- যা সমালোচকদের মতে হাসিনার শাসনামলে চরমভাবে সংকুচিত হয়েছিল, তরুণদের জন্য আরেকটি প্রধান ইস্যু। ২২ বছর বয়সী সাংবাদিক মোহাম্মদ সাইমুম জাহান বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমরা মন খুলে কথা বলতে পারিনি। যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, আমাদের কথা বলার স্বাধীনতা প্রয়োজন, এমনকি সরকারের সমালোচনা করার অধিকারও চাই।
গ্রামাঞ্চলের জেন-জি ভোটারদের মনোযোগ মূলত জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর। বগুড়ার একটি কৃষক পরিবারের ২১ বছর বয়সী ফারহানা আক্তার বলেন, বীজ ও সারের পেছনে আমরা অনেক টাকা খরচ করি, কিন্তু সবজি বিক্রির সময় ন্যায্য দাম পাই না। আমরা একদিনে অলৌকিক কিছু আশা করি না, তবে ধাপে ধাপে পরিস্থিতির উন্নতি চাই।

কিছু তরুণ ভোটার মনে করেন তারা নির্দিষ্ট কোনো বড় দলের বদলে এমন দলকে বেছে নেবেন যারা স্থানীয়ভাবে উন্নয়ন করতে পারবে। ২০ বছর বয়সী ঘোড়ার গাড়ি চালক মোহাম্মদ তারেক বলেন, এবার আমরা একটি শান্তিপূর্ণ দেশ চাই যেখানে তরুণরা জুয়া বা অপরাধের বদলে কাজ করে উপার্জন করতে পারবে।
তবে কিছু ভোটার এখনও সিদ্ধান্তহীন। ১৯ বছর বয়সী সুরাইয়া খাতুন বলেন, "আমার স্মৃতিতে কেবল আওয়ামী আমলই আছে। বিএনপি বা জামায়াত কীভাবে কাজ করে আমি জানি না। আমি এখনও ভাবছি কাকে ভোট দেব।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাও এই নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২৪ বছর বয়সী হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রমিলা রানী দাস বলেন, আমাদের সব সময় সংখ্যালঘু হিসেবে ট্যাগ দেওয়া হয়। এটি আমাদেরও দেশ। ২২ বছর বয়সী চালক মোহাম্মদ শাকিল বলেন, যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাকে আগে মানবতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। সব ধর্মের সাধারণ মানুষ শুধু শান্তিতে থাকতে চায়।
৭৪ লাখ টাকাসহ আটক জামায়াত নেতা রমেকের সিসিইউতে