মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রযুক্তিতে গড়ে তোলা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক বড়সড় ধসের খবর পাওয়া যাচ্ছে। ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, গত ৮ মার্চ মাত্র ২৪ ঘণ্টার এক ঝটিকা অভিযানে তারা আমেরিকার তৈরি অত্যাধুনিক ‘থাড’ মিসাইল শিল্ডের চারটি গুরুত্বপূর্ণ রাডার ধ্বংস করে দিয়েছে। যদি এই দাবি সত্য হয়, তবে এটি হবে আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে মার্কিন সামরিক প্রযুক্তির অন্যতম বড় বিপর্যয়। আইআরজিসির দাবির বিপরীতে পেন্টাগন কোন প্রতিক্রিয়া দেয়নি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনা এবং প্রেস টিভি জানিয়েছে, আইআরজিসি তাদের বিধ্বংসী গদর, এমাদ এবং খাইবার শেকান ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবহার করে এই নিখুঁত হামলা চালিয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এবার সরাসরি মিসাইল উৎক্ষেপণকারী যান বা ইন্টারসেপ্টর লক্ষ্য না করে আঘাত হেনেছে ‘সেন্সর’ বা রাডার ব্যবস্থায়। ইরানের দাবি, এ কৌশলে তারা সফলও হয়েছে।
রাডার হলো যে কোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ‘চোখ’। এই রাডারগুলো ধ্বংস হওয়ার ফলে ইসরাইল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খতমে আল-আনবিয়া সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, রাডারগুলো অকেজো হয়ে যাওয়ায় ইসরাইলি এয়ার-রেড সাইরেনগুলো মিসাইল আসার আগে বাজেনি, বরং আছড়ে পড়ার সময় বা পরে বেজেছে।

ইরানি বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, আরব সাগর থেকে জর্ডান পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের চারটি কৌশলগত অবস্থানে এই হামলা চালানো হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-রাবহা সাইটটি উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন অবকাঠামোর সাথে যুক্ত ছিল। এছাড়া, আমিরাতের আল-রুওয়াইসে একটি থাড ব্যাটারির রাডার ছিল যা আঞ্চলিক আকাশপথ পাহারা দিচ্ছিল।
ইরানি বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, আরব সাগর থেকে জর্ডান পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের চারটি কৌশলগত অবস্থানে এই হামলা চালানো হয়েছে।

১. আল-রাবহা, সংযুক্ত আরব আমিরাত: আমিরাতের এই সাইটটি উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন অবকাঠামোর সাথে যুক্ত ছিল।
২. আল-রুওয়াইস, সংযুক্ত আরব আমিরাত: এখানে একটি THAAD ব্যাটারির রাডার ছিল যা আঞ্চলিক আকাশপথ পাহারা দিচ্ছিল।
৩. আল-খারজ, সৌদি আরব: সৌদি আরবের এই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে মোতায়েন করা থাড রাডারটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
৪. আজরাক, জর্ডান: জর্ডানের মুওয়াফ্ফাক সালতি বিমান ঘাঁটির কাছে অবস্থিত মার্কিন রাডারটিও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

একটি মাত্র রাডারের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকা)। অর্থাৎ এক রাতেই ইরান প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন প্রযুক্তি ধ্বংসের দাবি করছে। ১৯৯০-এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ২০টির মতো এই ধরণের রাডার তৈরি করা হয়েছে। একটি রাডার নতুন করে তৈরি করতে প্রায় ৩০ মাস লাগে। চুক্তির পর হাতে পেতে চার বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এই রাডারগুলো না থাকলে থাড ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কোনো লক্ষ্যবস্তুকে চিহ্নিত বা ধ্বংস করতে পারবে না, যা মিত্র দেশগুলোকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সামনে অরক্ষিত করে তুলবে।

জর্ডানের মুওয়াফ্ফাক সালতি বিমান ঘাঁটিতে হামলার কিছু স্যাটেলাইট চিত্র এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের অস্পষ্ট বিবৃতি এই জল্পনাকে উসকে দিলেও, চারটি রাডারই সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনো স্বাধীন কোনো নিশ্চিয়তা মেলেনি। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি ইরানের একটি কৌশলগত ‘সিগন্যালিং’, যার মাধ্যমে তারা বোঝাতে চায়, আমেরিকার দামী প্রযুক্তি তাদের সস্তা ক্ষেপণাস্ত্রের কাছে নিরাপদ নয়।
তবে ওয়াশিংটন বা তেল আবিব এখন পর্যন্ত এই চারটি রাডার ধ্বংসের খবর নিয়ে রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে। যুদ্ধের এই ধোঁয়াশায় একপক্ষ যখন বড় জয়ের দাবি করছে, অন্যপক্ষ তখন তাদের সামরিক গোপনীয়তা রক্ষায় মরিয়া।
তথ্যসূত্র: ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া
