মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ নিয়ে এবার নিজ দেশেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি। ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস মারফি এক বিস্ফোরক মন্তব্যে জানিয়েছেন, ট্রাম্প এই যুদ্ধের ওপর ‘নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন’ এবং তার ভুল রণকৌশল পুরো অঞ্চলকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। এর আগেও বিরোধী শিবির থেকে যুদ্ধ নিয়ে তোপের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প।
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘দাদাগিরি’ কি তবে বুমেরাং হতে চলেছে? মার্কিন সিনেটর ক্রিস মারফির সাম্প্রতিক মন্তব্য অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক সিরিজ পোস্টে মারফি দাবি করেছেন, ট্রাম্প ইরানকে যতটা দুর্বল ভেবেছিলেন, তেহরান তার চেয়েও বেশি বিধ্বংসী রূপে পাল্টা আঘাত হানছে। মারফির ভাষায়, এটা এখন দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে ট্রাম্প এই যুদ্ধের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। পুরো অঞ্চল এখন জ্বলছে।

মারফি মনে করেন, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ইরানের সামর্থ্যকে তুচ্ছজ্ঞান করা। ট্রাম্প ভেবেছিলেন ইরান কখনোই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার সাহস দেখাবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরান শুধু ওই পথ বন্ধই করেনি, বরং ড্রোন, স্পিডবোট এবং সমুদ্রমাইন দিয়ে এমন এক গোলকধাঁধা তৈরি করেছে যা ভেদ করা মার্কিন নৌবাহিনীর জন্যও প্রায় অসম্ভব। মারফি ব্যঙ্গ করে বলেন, এই অস্ত্রগুলো ধ্বংস করা যাবে না, কারণ এগুলো সংখ্যায় অগণিত এবং সবখানে ছড়িয়ে আছে। ফলাফল? বিশ্ববাজারে তেলের দামে আগুন!
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে সস্তা ড্রোনের যে দাপট, ট্রাম্প তা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে মনে করেন এই সিনেটর। ইউক্রেন যুদ্ধের উদাহরণ টেনে মারফি বলেন, ট্রাম্প যদি ইউক্রেন যুদ্ধের দিকে নজর দিতেন, তবে বুঝতেন আধুনিক যুদ্ধ কৌশল কতটা বদলে গেছে। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি একটি মারাত্মক ভুল করেছেন। এখন ইরানের কমদামী ড্রোনগুলো যখন আরবের তেলক্ষেত্রগুলোতে অবিরাম আঘাত হানছে, তখন মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিমশিম খাচ্ছে। এমনকি ইসরাইলও ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র নিরোধক অস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসছে।
মারফি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এই যুদ্ধ শুধু ইরান বা ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও ময়দানে নেমেছে। ইয়েমেনের হুথিরা বর্তমানে কিছুটা শান্ত থাকলেও তারা যে কোনো সময় লোহিত সাগরে বিপর্যয় ঘটিয়ে দিতে পারে। এমনকি গৃহযুদ্ধ বিধ্বস্ত সিরিয়াও নতুন করে বিস্ফোরিত হতে পারে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই যুদ্ধের শেষ কোথায়? মারফির মতে, ট্রাম্পের কাছে কোনো ‘এন্ডগেম’ বা যুদ্ধ শেষের পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, স্থলপথে ইরান আক্রমণ করা মানেই হবে ‘আরমাগেডন’ (মহাপ্রলয়), যেখানে হাজার হাজার মার্কিন সেনার লাশ পড়বে। আবার হঠাৎ করে বিজয় ঘোষণা করে সরে আসলেও লাভ নেই, কারণ ইরানি কট্টরপন্থীরা দ্রুতই সব পুনর্গঠন করে ফেলবে।
সিনেটর মারফি স্পষ্টভাবেই ট্রাম্পকে তার ‘বোকামি’ বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, এর আগের কোনো প্রেসিডেন্টই এমন বোকামি করে যুদ্ধ শুরু করার সাহস দেখাননি। ট্রাম্পের জন্য এখন একটাই পথ খোলা আছে, নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিয়ে দ্রুত এই যুদ্ধ শেষ করা। নয়তো সামনে আরও বড় কোনো বিপর্যয় আমেরিকার জন্য অপেক্ষা করছে।
সিনেটর মারফির এই আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রমাণ করে যে, ইরানের সাথে এই যুদ্ধ শুধু রণাঙ্গনেই নয়, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি কি শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুনেই ভস্মীভূত হবে?
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই
ট্রাম্পের আহবানকে না বললো অস্ট্রেলিয়াও