ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত নিরসনে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যে দ্বিতীয় দফার আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা নাকচ করে দিয়েছে তেহরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দিলেও ইরান জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো আলোচনায় বসা সম্ভব নয়।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ২২ এপ্রিল শেষ হতে চললেও শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ এখন ঘোর অনিশ্চয়তার মুখে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসলামাবাদে আলোচনার জন্য প্রতিনিধি দল পাঠানোর ঘোষণা দিলেও ইরান সেই সম্ভাবনাকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অযৌক্তিক দাবি’ এবং ‘নৌ-অবরোধ’ বজায় থাকা অবস্থায় কোনো গঠনমূলক আলোচনা সম্ভব নয়।

ইরানি জাহাজ জব্দ ও প্রতিশোধের হুমকি
মার্কিন সামরিক বাহিনী রোবার জানায়, একটি ইরানি পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ ইরানের বন্দর আব্বাসের দিকে যাওয়ার সময় তারা সেটিকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, জাহাজটি এখন পুরোপুরি আমাদের হেফাজতে রয়েছে এবং ভেতরে কী আছে তা আমরা খতিয়ে দেখছি!
ইরান এই ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, জাহাজটি চীন থেকে আসছিল। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, এক সামরিক মুখপাত্র হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আমরা সতর্ক করছি, মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই সশস্ত্র জলদস্যুতার বিরুদ্ধে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী শীঘ্রই কঠোর জবাব ও প্রতিশোধ নেবে।"
এই পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি তার নির্ধারিত মেয়াদের শেষ দুই দিনও টিকবে কি না, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অঞ্চলটিতে একটি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাও বর্তমানে নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, মঙ্গলবার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র যে দ্বিতীয় দফার আলোচনার আশা করেছিল, তারা তাতে অংশ নেবে না।

আলোচনার খবরকে ‘ভুয়া’ আখ্যা
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার আলোচনার যে খবর ছড়িয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন একদিকে আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে ইরানের ওপর কঠোর নৌ-অবরোধারোপ করে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সি এক প্রতিবেদনে জানায়, যতক্ষণ পর্যন্ত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা না হচ্ছে, ততক্ষণ পাকিস্তানে কোনো প্রতিনিধি দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে আসছে। তিনি বলেন, মার্কিন প্রশাসনের অবাস্তব প্রত্যাশা, ঘনঘন অবস্থান পরিবর্তন এবং আক্রমণাত্মক কথাবার্তা আলোচনার পথে প্রধান অন্তরায়।
এছাড়া ইরানি জলসীমায় মার্কিন ডেস্ট্রয়ার কর্তৃক ইরানি জাহাজ আটকের ঘটনা উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোকাদ্দাম এই অবরোধকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, অবরোধ জারি রেখে কূটনীতির নাটক করা যায় না।

ট্রাম্পের হুমকি ও আশাবাদ
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক্সে এবং তার নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে জানিয়েছেন, তার তিন প্রতিনিধি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার ইসলামাবাদের পথে রয়েছেন। ট্রাম্প দাবি করেন, চুক্তির মূল কাঠামো তৈরি হয়ে গেছে এবং তিনি এটি নিয়ে আশাবাদী। তবে তিনি আবারও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি এই ‘ন্যায্য চুক্তি’ মেনে না নেয়, তবে তাদের জাতীয় অবকাঠামো ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হবে।
পরমাণু ইস্যুতে তেহরানের অবস্থান
ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাদের কাছে থাকা পারমাণবিক উপকরণ অন্যদেশে পাঠানোর কোনো প্রস্তাবই আলোচনার টেবিলে রাখা হবে না। মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আলটিমেটাম বা ডেডলাইনে বিশ্বাস করি না। তবে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান কিছুটা নরম সুরে জানিয়েছেন, যুদ্ধ কারও স্বার্থ রক্ষা করে না এবং উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স-বিবিসি-এনডিটিভি
