ঠিক আট বছর আগের কথা। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে যখন প্রথমবারের মতো বেজে উঠেছিল পানামার জাতীয় সঙ্গীত, আবেগে কেঁদে ফেলেছিল পুরো দেশ। সেই গর্বের জোয়ারে আরও একবার ভাসার সুবর্ণ সুযোগ চলে এসেছে। সব বাধা পেরিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নিজেদের টিকিট পাকা করেছে সেন্ট্রাল আমেরিকার এই সর্বোচ্চ র্যাঙ্কিংধারী দেশটি। তবে এবার তারা শুধু অংশ নেওয়ার জন্য আসছে না; বড় বড় পরাশক্তিদের চোখে চোখ রেখে লড়াই করতে এবং নিজেদের আঞ্চলিক ফুটবল পরাশক্তি হিসেবে জানান দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত কোচ থমাস ক্রিস্টিয়ানসেনের শিষ্যরা।
১১ জুনের মহাযজ্ঞ শুরুর আগে লস ক্যানালেরোস বা ‘দ্য ক্যানাল মেন’ (পানামা খাল থেকে অনুপ্রাণিত নাম) খ্যাত দলটিকে নিয়ে জেনে নেওয়া যাক সব খুটিনাটি:

যে রোমাঞ্চকর পথ পেরিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট: বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে পানামাকে পার হতে হয়েছে কনকাকাফ অঞ্চলের দুই রাউন্ডের কঠিন বৈতরণী। দ্বিতীয় রাউন্ডে নিকারাগুয়া, গায়ানা, মন্টসেরাট এবং বেলিজকে উড়িয়ে দিয়ে নিখুঁত রেকর্ডে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় তারা। এই যাত্রায় তারা ১০টি গোল করার বিপরীতে হজম করেছিল মাত্র ১টি।
তবে আসল নাটক জমে ওঠে চূড়ান্ত রাউন্ডে। সুরিনাম, গুয়াতেমালা এবং এল সালভাদরের সাথে একই গ্রুপে পড়ে প্রথম চার ম্যাচ শেষে পানামার ঝুলিতে ছিল মাত্র ৬ পয়েন্ট। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর ঠিক সময়ে স্বরূপে ফেরে ক্রিস্টিয়ানসেনের দল। প্রথমে গুয়াতেমালাকে ৩-২ ব্যবধানে হারানোর পর, গত ১৮ নভেম্বরের ভাগ্যনির্ধারণী শেষ ম্যাচে এল সালভাদরকে ৩-০ গোলে গুঁড়িয়ে দেয় পানামা। এই মহাকাব্যিক জয়ে সুরিনামকে টপকে তারা নিশ্চিত করে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চ।

অতীতের স্মৃতি এবং বর্তমানের হুঙ্কার: ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে নিজেদের অভিষেক আসরে বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড ও তিউনিসিয়ার কাছে হেরে গ্রুপের তলানিতে থেকে বিদায় নিয়েছিল পানামা। তবে, সেই আসরে ইংলিশদের বিপক্ষে ফিলিপ ব্যালয়ের ঐতিহাসিক গোলটি এখনো পানামাবাসীর হৃদয়ে অম্লান, যা ছিল বিশ্বকাপে তাদের প্রথম ও একমাত্র গোল। তবে সেই অতীত এখন ইতিহাস।
গত কয়েক বছরে পানামা নিজেদের দারুণভাবে বদলে ফেলেছে। ২০২৩ সালের কনকাকাফ গোল্ড কাপের ফাইনাল এবং ২০২৫ সালের নেশনস লিগের ফাইনালে খেলা দলটি এখন ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ৩৩ নম্বরে থেকে সেন্ট্রাল আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় নিয়ে ঘুরছে।

কঠিন গ্রুপে ‘ক্যানাল মেন’দের অগ্নিপরীক্ষা: এবারের বিশ্বকাপে পানামা পড়েছে এল-গ্রুপে, যাকে বোদ্ধারা এই টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় কঠিনতম গ্রুপ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। নক-আউট পর্বে যেতে হলে তাদের লড়াই করতে হবে সাবেক চ্যাম্পিয়ন ও শিরোপা প্রত্যাশী ইংল্যান্ড, গত আসরের তৃতীয় স্থানাধিকারী ক্রোয়েশিয়া এবং আফ্রিকার ব্ল্যাক স্টার খ্যাত ঘানার বিরুদ্ধে।
গ্রুপ পর্বের দুটি ম্যাচ কানাডায় এবং একটি ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্রে খেলবে পানামা। ১৭ জুন টরন্টো স্টেডিয়ামে ঘানার বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে তাদের অভিযান শুরু হবে। এরপর ২৩ জুন একই মাঠে ক্রোয়েশিয়া এবং ২৭ জুন নিউজার্সি স্টেডিয়ামে তারা মুখোমুখি হবে শক্তিশালী ইংল্যান্ডের।

মাস্টারমাইন্ড ক্রিস্টিয়ানসেনের স্বপ্নপূরণ: ২০২০ সাল থেকে পানামার কোচের দায়িত্বে আছেন থমাস ক্রিস্টিয়ানসেন, যা দেশটির ইতিহাসে যেকোনো কোচের দীর্ঘতম মেয়াদ। এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সাইপ্রাস ছাড়াও ইংল্যান্ডের লিডস ইউনাইটেড এবং বেলজিয়ামের ইউনিয়ন এসজির মতো ক্লাবে কোচিং করিয়েছেন তিনি।
ডেনমার্কে জন্ম নেয়া এই সাবেক স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড ২০০২-০৩ মৌসুমে জার্মানির বুন্দেসলিগার সর্বোচ্চ গোলদাতাও ছিলেন। এতদিন গ্যালারিতে বসে বিশ্বকাপ দেখলেও এই প্রথম কোচ হিসেবে ডাগআউটে দাঁড়াবেন তিনি। ক্রিস্টিয়ানসেন আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সময় হয়তো নিজেকে চিমটি কেটে দেখতে হবে যে এটা স্বপ্ন নাকি বাস্তব। আমি যে দেশকে এতো ভালোবাসি, তার প্রতিনিধিত্ব করাটা হবে চরম গৌরবের।"

যাঁদের ওপর ভরসা রাখছে পানামা: বাছাইপর্বে ৩টি করে গোল করে পানামার প্রধান আক্রমণের অস্ত্র হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছেন অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড হোসে ফাজার্দো এবং উইঙ্গার পুমা। স্ট্রাইকার সেসিলিও ওয়াটারম্যান করেছেন ২টি গোল। মধ্যমাঠের নিয়ন্ত্রণ থাকবে আদালবার্তো কারাসকুইলার পায়ে, যিনি দলের ছক বজায় রাখতে সিদ্ধহস্ত। এছাড়া ক্রিস্টিয়ানসেনের অধীনে ডানা মেলেছেন তরুণ তুর্কি কার্লোস হার্ভে। আর অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে দলের মেরুদণ্ড হিসেবে থাকছেন অ্যানিবাল গডয় এবং আমির মুরিলোর মতো তারকারা।

প্রস্তুতির জোর এবং কোচের প্রচ্ছন্ন হুমকি: বিশ্বকাপের প্রস্তুতি হিসেবে গত মার্চের শেষের দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলেছে পানামা। ডারবানে প্রথম ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র করার পর কেপটাউনে দ্বিতীয় ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয় তারা। মূল টুর্নামেন্ট শুরুর আড়াই সপ্তাহ আগে, আগামী ৩১ মে রিও ডি জেনেরিওতে অন্যতম ফেভারিট ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়ে নিজেদের শেষ মুহূর্তের ধার ঝালিয়ে নেবে লস ক্যানালেরোসরা।
অতীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় দলকে হারানোর অভিজ্ঞতা থেকে আত্মবিশ্বাস খুঁজছেন কোচ ক্রিস্টিয়ানসেন। গ্রুপটি কঠিন হলেও সমর্থকদের উদ্দেশ্যে তার পরিষ্কার বার্তা- আমরা চাই আমাদের ভক্তরা যেন বুক ফুলিয়ে গর্ব করতে পারেন। শুধু একটা সান্ত্বনামূলক গোল উদযাপনের দিন শেষ। এবার আমাদের খেলার মান আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার এবং বড় কিছু করে দেখানোর সময় এসেছে!
