রিও ডি জেনিরোর বিখ্যাত ‘মিউজিয়াম অব টুমোরো’-তে কোচ কার্লো আনচেলত্তি যখন ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণা করলেন, তখন পুরো ফুটবল বিশ্বের চোখ আটকে ছিল একটা নামের ওপর-নেইমার জুনিয়র। মাসব্যাপী চলা জাতীয় বিতর্ক, কোটি ভক্তের উন্মাদনা আর সতীর্থদের মনস্তাত্ত্বিক চাপকে একপাশে সরিয়ে ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড শেষ পর্যন্ত সান্তোসের এই ফরোয়ার্ডকে দলে নিয়েছেন ঠিকই, তবে দল ঘোষণার পর সংবাদ সম্মেলনে নেইমারকে নিয়ে যে কড়া ও পেশাদার মন্তব্য করেছেন, তাতে স্পষ্ট, বিশ্বকাপের মঞ্চে নামের জোরে কোনো পারপাস সার্ভ হবে না!

নেইমারকে দলে নেওয়া প্রসঙ্গে আনচেলত্তি সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো আবেগ বা গণমাধ্যমের চাপে পড়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে নিখুঁত মেডিকেল ও ফিজিক্যাল ডেটা দিয়ে। আনচেলত্তি বলেন, আমরা পুরো বছর ধরে নেইমারকে মূল্যায়ন করেছি। সাম্প্রতিক সময়ে ও টানা ম্যাচ খেলছে এবং ওর শারীরিক অবস্থার নাটকীয় উন্নতি হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি ও এই বিশ্বকাপে দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তবে এর পরেই নেইমারকে একাদশের অন্য ২৫ জন খেলোয়াড়ের সমান্তরালে দাঁড় করিয়ে একচুলও ছাড় না দেয়ার বার্তা দিয়েছেন এই রিয়াল মাদ্রিদ কিংবদন্তি কোচ। আনচেলত্তি কড়া ভাষায় যোগ করেন, স্কোয়াডের বাকি ২৫ জন খেলোয়াড়ের যে ভূমিকা ও বাধ্যবাধকতা রয়েছে, নেইমারের ক্ষেত্রেও তা এক। ও শুরুর একাদশে খেলতে পারে, নাও খেলতে পারে, বেঞ্চে বসে থাকতে পারে কিংবা বদলি হিসেবে মাঠে নামতে পারে, দায়িত্ব সবার ঠিক সমান।”

যখন সাংবাদিকরা জানতে চান নেইমার বিশ্বকাপে ঠিক কত মিনিট খেলার সুযোগ পাবেন, তখন আনচেলত্তি বেশ সতর্ক ও তীক্ষ্ণ সুরে বলেন, যদি ও মাঠে নামার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে, তবেই খেলবে। আজ আমার মাথায় একটা সম্ভাব্য শুরুর একাদশ থাকতে পারে, কিন্তু মাঠে নামানোর আগে আমি দেখব খেলোয়াড়রা অনুশীলনে কেমন করছে এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কেমন।
কৌশলগত বিষয়ের বাইরে নেইমারের অন্তর্ভুক্তি ব্রাজিলের ভঙ্গুর ড্রেসিংরুমের জন্য কতটা টনিক হিসেবে কাজ করবে, তা অকপটে স্বীকার করেছেন আনচেলত্তি। চোটের কারণে গতি কমলেও নেইমারের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা এবং দলের ভেতর তাঁর প্রতি সতীর্থদের যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রয়েছে, তা দলের পরিবেশকে একদম বদলে দিতে পারে। কোচের মতে, বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে নিজের কন্ডিশন আরও উন্নত করার সুযোগ পাবেন নেইমার, এবং তাঁর উপস্থিতি পুরো স্কোয়াডকে তাদের সেরা পারফরম্যান্স উগড়ে দিতে মানসিকভাবে সাহায্য করবে।

বার্সেলোনা বা পিএসজির সেই সোনালী দিনগুলোতে বা-প্রান্ত দিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া নেইমার আর আজকের ৩৪ বছর বয়সী নেইমার এক নন। বয়স আর চোটের আঘাতে সেই সাইডলাইন টু সাইডলাইন দৌড়ানোর বিধ্বংসী গতি আজ আর নেই। তাহলে আনচেলত্তির ‘সেলেসাও’ শিবিরে নেইমার খেলবেন কোথায়?
এই রণকৌশলগত রহস্যের জট খুলেছেন আনচেলত্তি নিজেই। তিনি নিশ্চিত করেছেন, এই বিশ্বকাপে তিনি নেইমারকে মূলত ‘সেন্ট্রাল পজিশনের ফরোয়ার্ড’ হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ, একজন প্রথাগত স্ট্রাইকারের ঠিক পেছনে থেকে তিনি ‘অ্যাডভান্সড প্লে-মেকার’ বা আক্রমণাত্মক চালকের ভূমিকা পালন করবেন। প্রয়োজনে তাঁকে ‘ফলস নাইন’ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

বর্তমানে সান্তোসের হয়ে নেইমারের খেলার ধরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি কাগজে-কলমে ৯ নম্বর পজিশনে থাকলেও বক্সের ভেতর আটকে থাকেন না। বরং বা-দিক থেকে ভেতরে ঢুকে মাঠের মাঝখানের ফাঁকা জায়গাগুলো নিয়ন্ত্রণে নেন। গতি দিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়ার চেয়ে নিখুঁত পাসিং ভিশন দিয়ে খেলার গতি নির্ধারণ করা এবং প্রতিপক্ষের জমাট রক্ষণভাগ ভেঙে ফেলার এই নতুন ‘ব্লুপ্রিন্ট’ দিয়েই এবার সেলেসাওদের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বুনছেন কার্লো আনচেলত্তি।
