বিগত দুই দশক ধরে ফুটবল বিশ্বকাপকে নিজের ব্যক্তিগত থিয়েটার বা নাট্যমঞ্চ বানিয়ে রেখেছেন মেক্সিকান গোলরক্ষক গুইলার্মো ওচোয়া। তবে সময়ের বিবর্তনে এই অভিজ্ঞ বাঘা গোলরক্ষক এখন কেবল স্কোয়াডের একজন সদস্য নন, বরং মেক্সিকো ফুটবল দলের 'স্মৃতি বনাম নতুনত্বের' এক জটিল প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
বিশ্বকাপের অন্যতম সহ-আয়োজক মেক্সিকো ঘরের মাঠে তাদের গ্রুপ 'এ'-এর অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচের পর গুয়াদালাহারায় দক্ষিণ কোরিয়া এবং মেক্সিকো সিটিতে চেক প্রজাতন্ত্রের মুখোমুখি হবে তারা। ঘরের মাঠে খেলা হওয়ায় দলের প্রতিটি নির্বাচন এবং প্রধান কোচ হাভিয়ের আগুইরের দল পুনর্গঠনের প্রজেক্ট এখন তীব্র আতশিকাচের নিচে।
বিশ্বমঞ্চে ওচোয়ার উপস্থিতি শুধুই আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, তার পেছনে রয়েছে অকাট্য যুক্তি। ২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে তার অতিমানবীয় সব সেভ কিংবা কাতারে পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেয়া, এসব কীর্তি তাকে মেক্সিকোর ফুটবলের সমার্থক বানিয়ে তুলেছে। ইতিমধ্যে পাঁচটি বিশ্বকাপের স্কোয়াডে থাকা এবং গত তিনটি আসরে মূল একাদশে খেলা ওচোয়া এখনো এল ত্রি’দের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সেনাপতি, যার আন্তর্জাতিক স্তরে নেতৃত্ব দেয়ার প্রমাণিত ক্ষমতা রয়েছে।
কোচ আগুইরের এই অভিজ্ঞতার ওপর মেক্সিকোর মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডের এডসন আলভারেজ মাঝমাঠে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, ফুলহ্যামের রাউল জিমেনেজ আক্রমণভাগে অভিজ্ঞতার দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন, আর রক্ষণভাগে জোহান ভাস্কেজ ও সিজার মন্তেসের মতো পরীক্ষিত ডিফেন্ডাররা তৈরি করছেন এক দুর্ভেদ্য দেয়াল।
তবে মেক্সিকোর ফুটবল মহলে এখন সবচেয়ে বেশি শোরগোল হচ্ছে নিচ থেকে উঠে আসা তরুণ তুর্কিদের নিয়ে। মাত্র ১৭ বছর বয়সী টিজুয়ানার অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার গিলবার্তো মোরা এই মুহূর্তে মেক্সিকান ফুটবলের ভবিষ্যৎ আশার আলো। তার পাশাপাশি চিভাসের ২৩ বছর বয়সী স্ট্রাইকার আরমান্দো 'হোরমিগা' গঞ্জালেজ ঘরোয়া লিগের দুর্দান্ত ফর্ম নিয়ে আক্রমণভাগে ভিন্ন ধারার ধার বাড়াচ্ছেন। আবার লিগা এমএক্স-এর বাইরে থেকে সিয়াটল সাউন্ডার্সের ২০ বছর বয়সী মিডফিল্ডার ওবেদ ভার্গাস যোগ করছেন নতুন বিকল্প।
অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের মিশ্রণই এখন মেক্সিকোর অন্দরে এক মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন তৈরি করেছে। ঘরের মাঠের আকাশচুম্বী চাপ ও বাইরের শোরগোল সামলাতে ওচোয়া ও অন্য অভিজ্ঞরা ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারেন; অন্যদিকে তরুণরা দলে যোগ করতে পারেন গতি, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং এই বিশ্বাস যে, বিশ্বকাপ শুধু একটি চেনা প্রজন্মের বিদায়ী সফর বা 'ফেয়ারওয়েল ট্যুর' নয়, বরং নতুন শুরুর গল্প।
কোচ হাভিয়ের আগুইরের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো আবেগে না ভেসে দলে ভারসাম্য বজায় রাখা। অতিরিক্ত সাবধানী হতে গেলে দল পুরোনো চেনা ছকে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে, আবার রাতারাতি অতিরিক্ত তারুণ্যের ওপর ভরসা করলে আন্তর্জাতিক ফুটবলের কঠিন চাপের মুখে অনভিজ্ঞরা খেই হারিয়ে ফেলতে পারে। মেক্সিকোর সাফল্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে এই দুই প্রজন্মকে এক সুতোয় বাঁধার ওপর, যাতে বড় মঞ্চ সামলানোর মতো অভিজ্ঞতাও থাকে, আবার ম্যাচের ভাগ্য এক নিমেষে বদলে দেওয়ার মতো তরুণ রক্তও মজুদ থাকে।
বিশ্বকাপের জন্য ইকুয়েডরের শক্তিশালী স্কোয়াড ঘোষণা
পানামাকে গোলবন্যায় ভাসিয়ে বিশ্বকাপের হুংকার ছাড়ল ব্রাজিল
উন্দাভ ম্যাজিকেফিনল্যান্ডের জালে জার্মানির গোল উৎসব