দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কার্যকর নয়, এমন তালাকের অজুহাত দেখিয়ে স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ এড়ানো যাবে না বলে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট করে বলেছেন, সন্তানের ভরণপোষণ তার একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনি অধিকার, যা মা-বাবার তালাকসংক্রান্ত বিরোধের ওপর কোনোভাবেই নির্ভরশীল নয়। এই রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে হাইকোর্ট তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পর্যবেক্ষণ ও নীতি সুদৃঢ়ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) এ সংক্রান্ত মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি বিচারপতি আবদুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই যুগান্তকারী রায়টি দেন।
নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালে বিয়ে হওয়া এক নারী তার ও নাবালক কন্যাসন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের দাবিতে পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। মামলার পর স্বামী দাবি করেন, তিনি আগেই স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। তবে মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ অনুযায়ী সেই তালাক কার্যকর করার কোনো আইনি প্রমাণ তিনি আদালতে দাখিল করতে ব্যর্থ হন।
ফলে, পারিবারিক আদালত স্ত্রী ও সন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের ডিক্রি জারি করেন। পরে স্বামী ডিক্রি জারি ঠেকাতে নতুন একটি ঘোষণামূলক মামলা করেন এবং তালাক কার্যকর হয়েছে দাবি করে ভরণপোষণের আদেশ স্থগিতের আবেদন জানান। নিম্ন আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দিলে তিনি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল রেখে স্বামীর আবেদনটি খারিজ করে দেন।
রিভিশন আবেদনটি খারিজ করার পাশাপাশি রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি সুদৃঢ়ভাবে ব্যাখ্যা করেন।
প্রথমটিতে বলা হয় তালাকের আইনি কার্যকারিতা অবশ্যই প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালতে যথাযথভাবে প্রমাণিত হতে হবে। মুখের কথা বা অকার্যকর নথির অজুহাতে দায় এড়ানো যাবে না।
দ্বিতীয়ত নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনি অধিকার; মা-বাবার মধ্যকার যেকোনো বিরোধ বা তালাকের জেরে এটি কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না।
তৃতীয়তা নতুন কোনো মামলা দায়ের করে আদালতের চূড়ান্ত ডিক্রি (রায়ের আদেশ) বাস্তবায়নকে কোনোভাবেই বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করা যাবে না।
এছাড়া রায়ে আরও বলা হয়, বিয়ে, তালাক, দেনমোহর ও ভরণপোষণ সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র এখতিয়ার পারিবারিক আদালতের। ডিক্রি জারি বা এক্সিকিউশন কোর্টের দায়িত্ব কেবল আদালতের বিদ্যমান আদেশ বাস্তবায়ন করা; তারা নতুন করে তালাক বৈধ কি না, তা বিচার করতে পারে না। যদি স্বামী সত্যিই বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান চান, তবে আইন অনুযায়ী নতুন করে তালাক দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, কিন্তু তা পূর্বের ডিক্রি অনুযায়ী দেনমোহর ও ভরণপোষণের দায় থেকে তাকে মুক্তি দেবে না।
হাইকোর্ট স্বামীকে অবিলম্বে দেনমোহরের বকেয়া এবং স্ত্রী ও সন্তানের যাবতীয় বকেয়া ভরণপোষণ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন।
হাইকোর্টের এই রায় প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান সাংবাদিকদের বলেন, আমার মতে এই রায় নারী ও শিশুর অধিকার সুরক্ষা এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী ও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
