বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। ব্যাংকগুলো মনে করছে, নীতিসহায়তার নানা সুবিধা দিলেও তাতে বাস্তব সমস্যা কমছে না; বরং খেলাপি ঋণ আরও বাড়ছে। সেপ্টেম্বর শেষে মোট খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে। ব্যাংকগুলোর দাবি, ব্যবসা–বাণিজ্যের ধীরগতি এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের পলাতক থাকার কারণে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনতে আইন প্রয়োগই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হতে পারে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেশের ব্যাংকখাত ছিল নাজুক অবস্থায়। নতুন সরকার এসেই লুকানো খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করেছে, যা কিছুটা স্বচ্ছতা এনেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু দীর্ঘসময় ধরে জমে থাকা এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন। ব্যাংকাররা বলছেন, খেলাপি কমাতে আদায়ের বিকল্প নেই। তবে ৫ আগস্টের পর হাজারো রাজনৈতিক প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় বা গা–ঢাকা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। অন্যদিকে দেশের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ দুর্বল থাকায় অনেক নিয়মিত ব্যবসায়ীও সময়মতো ঋণের কিস্তি শোধ করতে পারছেন না।
চলতি বছরের শুরুতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতিসহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল এসব প্রতিষ্ঠানকে দাঁড়াতে সহায়তা করা, যাতে ঋণও আদায় হয়। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেওয়া হয়। তখন আশা করা হয়েছিল খেলাপি ঋণ কমবে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টো- নতুন নীতি সুবিধার পর খেলাপি ঋণ ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার একটি পঙ্গু অর্থনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। এর মধ্যে কিছুটা উন্নতি হলেও সম্পূর্ণভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা অর্থনীতিতে গভীর আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় ব্যবসা স্থবির হয়ে আছে। বিনিয়োগ না থাকলে নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হয় না। ফলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি খুবই সীমিত।
এদিকে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের অপকৌশল ঠেকাতে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। পূর্বে দেখা যেত- যে গ্রাহককে ব্যাংক খেলাপি ঘোষণা করত, তিনি সঙ্গে সঙ্গে আদালতে রিট করে ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া থামিয়ে দিতেন। এবার সরকার প্রস্তাবিত অর্থঋণ আদালত অধ্যাদেশ ২০২৫–এ খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য কঠোর শর্ত রাখছে। সেখানে বলা হয়েছে, আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে চাইলে অনাদায়ী ঋণের ৫০ শতাংশ এবং রিভিউ করতে চাইলে ৭৫ শতাংশ জমা দিতে হবে। পাশাপাশি রায়ের ভিত্তিতে গ্রাহকের নামে-বেনামে থাকা দেশি-বিদেশি সম্পদ বিক্রি করে ঋণ আদায়ের পথও খোলা রাখা হচ্ছে।
গত ১২ নভেম্বর ব্যাংকগুলোকে নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আমানত–ঋণখাতের দায়িত্বরত ব্যাংকাররা স্পষ্টভাবে জানান, বর্তমান নীতিসহায়তায় খেলাপি ঋণ কমবে না। বরং কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। অনেক ব্যবসায়ী মাত্র ১–২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করছেন, কিন্তু পরবর্তী ব্যবসায়িক পরিকল্পনা দিচ্ছেন না। মামলা দায়ের হলে রিট করে প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করছেন। এতে আমানতকারীদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যাংকাররা রিট শুনানিতে ঋণগ্রহীতা ও ব্যাংক উভয়ের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার দাবি তুলেছেন।
ব্যাংকগুলো আরও বলছে, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকা উচিত। এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাশরুর আরিফিন বলেন, অনেক খেলাপির বিপুল দেশীয় সম্পদ রয়েছে, যা বিক্রি করলে ঋণের বেশ কিছু অংশ পাওয়া সম্ভব। পাশাপাশি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নেওয়া ঋণ ফেরত দিচ্ছে না, তাই এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। তিনি আরও বলেন, নীতিসহায়তা এখন ব্যাংক খাতের জন্য “সমস্যার উৎস” হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিয়মিত গ্রাহকরাও এতে উৎসাহ হারাচ্ছেন।
মধুমতি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও একই মত দেন। তার মতে, খেলাপিদের বিদেশযাত্রা নিষেধ, নাগরিক সুবিধা সীমিতকরণ এবং সামাজিকভাবে বয়কট করার মতো কঠোর ব্যবস্থা ছাড়া খেলাপি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যেসব ব্যাংকের খেলাপি বেশি, তাদের বাঁচাতে দ্রুত ঋণ আদায় ছাড়া বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংখ্যা ৩,৪৮৩ জন। তাদের কাছে আটকে আছে ২৮ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। এরা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ ফেরত দিচ্ছেন না; বরং নানা কৌশলে ব্যাংকের টাকা নিয়ে ফেলছেন। বিগত সময়ে আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট অনেক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বিভিন্ন ব্যবসায় সরাসরি জড়িত ছিলেন। সরকার পতনের আগাম আভাস পেয়ে অনেকে দেশ ছেড়েছেন, কেউ গা–ঢাকা দিয়েছেন। এতে তাদের ব্যবসা অচল হয়ে ব্যাংকের ঋণ আদায় প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়েছে।
এ অবস্থাকে “খারাপ বার্তা” বলে অভিহিত করেছেন বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী। তার মতে, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার এখন প্রায় ৩৬ শতাংশ, যা আরও বাড়তে পারে। নীতিসহায়তা খেলাপিদের উৎসাহিত করছে এবং নিয়মিত গ্রাহকদের হতাশ করছে। তবে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করে খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা কঠোর করায় প্রকৃত পরিস্থিতি দৃশ্যমান হওয়া ইতিবাচক দিক বলে তিনি মনে করেন।
খেলাপি ঋণের সমাধানে তিনি সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে অনিচ্ছাকৃত খেলাপিদের জন্য প্রয়োজনমতো নীতি–সহায়তা, ব্যাংকিং সমাধান ও নতুন অর্থায়নের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। সমস্যা চিহ্নিত না করলে সমাধান সম্ভব নয়-এই বাস্তবতাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
৩০ নভেম্বরের মধ্যে নীতি সহায়তা পাচ্ছে খেলাপি ঋণ
দেশে রেকর্ড ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ
লুকানো ঋণ সামনে আসায় বেড়েছে খেলাপির হার: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
বিশ্বে খেলাপি ঋণের হারে সবার ওপরে বাংলাদেশ