প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, আদিবাসী ও নারী-পুরুষের বিভেদসহ সমাজের নানামুখী বৈষম্য দূর করা করতে জাতীয় ঐক্যের উপর জোর দিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিবিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, সংস্কার খুব বড় স্বপ্ন, ঐক্য তার জন্য দরকার, নির্বাচনেও যেতে হবে। কিন্তু তার আগে মানুষকে স্বস্তি দিতে হবে।
শুক্রবার দুপুরে, রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের মিলনায়তনে ‘ঐক্য কোন পথে’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ঐক্য, সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে দুই দিনব্যাপী এই সংলাপের আয়োজন করেছে ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ। সকালে ভার্চুয়ালি দুই দিনের এই জাতীয় সংলাপের উদ্বোধন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
অর্থনীতিবিদ ডক্টর দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সংস্কারমুখী মানুষকে আইনশৃঙ্খলা না দিয়ে, তার খাওয়ার ব্যবস্থা না করে, চাকরির নিশ্চয়তা না দিয়ে বিপথে নিয়ে যাবেন না। সর্বোত্তম পেতে গিয়ে আমরা যেন উত্তমকে হারিয়ে না ফেলি। আমরা সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে চাই, কিন্তু এই মুহূর্তের সমস্যাগুলো মনোযোগে না নিলে ওই জায়গাটায় পৌঁছানো যাবে না।

তিনি আরও বলেন, পিছিয়ে পড়া, নদীভাঙনের মধ্যে থাকা, আদিবাসী, দলিত সম্প্রদায়, নারী-পুরুষের ভেতরে বিভেদ, ধর্মীয় চিন্তার ভেতরে বিভেদ, লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে বিভেদ- সেই মানুষগুলোর বেঁচে থাকা, কথা বলা, সমাবেশ করা, জীবিকা নির্বাহ করার অধিকার থাকবে- সেই নিশ্চয়তা আমাদের পেতে হবে। সেই ঐক্যের বাংলাদেশ আমাদের গড়তে হবে। একটা ন্যূনতম জায়গায় আমাদের একমত হতে হবে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কী নিয়ে ঐক্য হবে, এই নিয়ে আমরা সাধারণ আলোচনা করেছি এবং খুব পরিষ্কারভাবে এসেছে আমাদের ইতিহাসের উপলব্ধি থেকে ঐক্য না, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ঐক্য করতে হবে৷ এটি হলো ঐক্যের জায়গা। ইতিহাসের বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা-বিবরণ নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করে ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে নিয়ে, আমাদের স্বপ্নের জায়গা নিয়ে ঐক্য করতে হবে।
তিনি আরও যোগ করেন, আমরা মনে হয় এই জায়গাটা ক্রমান্বয়ে পরিষ্কার হচ্ছে। ওই যে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ আমরা যে যার আদর্শিক রাজনীতির বিভিন্ন অবস্থান থেকে দেখব, তার কি ন্যূনতম কোনো জায়গা আছে কি না, যেখানে আমরা একমত হতে পারব। যে মত আমাকে বলবে গণতন্ত্র থাকবে, স্বেচ্ছাচারিতা, নির্যাতন, নিপীড়ন থাকবে না এবং বিকাশের সুযোগ থাকবে?

সর্বজনীন মানবাধিকার থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কাঠামোগত প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়ে অনেক আলোচনা হলেও এর মধ্যে ঘাটতি লাগার বিষয় আছে। আর তা হলো, উপরিকাঠামো নিয়ে যতখানি আলোচনা হচ্ছে, এই দেশ-সমাজের ভিত্তি নিয়ে তত আলোচনা হয় না।
তিনি বলেন, এই আলোচনা শোনা যায় না যে গার্মেন্টস শ্রমিকের বেতন কত হবে, সে ন্যায্য মজুরি কীভাবে পাবে, কৃষক ফসলের দাম পাবে কি না, এই মুহূর্তে মধ্যবিত্ত ৮০ টাকায় শাকের আঁটি কেমন করে খাবে? সেই আলোচনা তো আসেনি। একবারও তো আলোচনা হলো না যুবসমাজের কর্মসংস্থান কেমন করে হবে। সেই সংস্কার কি আমরা দেখেছি। কীসের উপরিকাঠামো সংস্কার করবেন, যদি আমার ভিত ঠিক না থাকে। আসল ক্ষমতায়ন তো রুটি-রুজির ক্ষমতায়ন। খুব কষ্ট লাগে, এই বিষয়গুলো আমাদের নেতারা দেখছেন না।
সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা নিয়ে আলোচনা চললেও বাদবাকি মানুষ কোথা থেকে মহার্ঘ ভাতা পাবে সেই আলোচনা শোনা যায় না বলেন দেবপ্রিয়। শিক্ষিত যুবসমাজের জন্য কোনো ভাতার প্রচলন হবে কি না, সেটাও শোনা যায় না বলেন তিনি।
সময়ের মধ্যে শ্বেতপত্র তৈরি করতে পারায় গর্ববোধ করেন বলে জানান দেবপ্রিয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আপনারা কল্পনা করতে পারবেন না লুণ্ঠনের মাত্রাটা কী, কী ভয়ংকর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। এটাকে ঠিক করতে হবে।
জাতীয় সংলপের প্রথম দিনের অধিবেশনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জামায়াতের সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, রাষ্ট্রদূত মুশফিক ফজল আনসারী প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ডা. জাহেদ উর রহমান।
প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে নির্বাচন চায় বিএনপি: ফখরুল
ভোটার হওয়ার বয়স ১৭ হওয়া উচিত: প্রধান উপদেষ্টা