৪৭ বছর পর মায়ের খোঁজে নরওয়ে থেকে বাংলাদেশে ছুটে এসেছেন সেলিনা। মা নূরজাহান ছোট্ট সেলিনাকে নিয়ে মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন। কিন্তু বাচ্চা নিয়ে কেউ কাজে রাখতে চায় না। তাই বাধ্য হয়ে মাত্র তিন বছর বয়সে সেলিনাকে দত্তক দেন। সেই সেলিনার ঠাঁই হয় নরওয়ে। তার নাম হয় সেলিনা ক্লোফটেন। প্রায় একমাস ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মা নূরজাহানকে খুঁজেছেন সেলিনা। কিন্তু সন্ধান মেলেনি।
৫ জানুয়ারি ১৯৭৪ সালে সেলিনার জন্ম। ১৯৭৭ সালের ২৪ জানুয়ারি ছোট সেলিনা পাড়ি দেয় নরওয়ে। সেখানে শিক্ষক বাবা-মা ব্রেনজুণ্ফ আর কারি ক্লোফটেনের কাছে দুই ভাইয়ের সাথে ছোট গ্রাম স্কাগে বড় হন সেলিনা। এখন নিজেরই তিন সন্তানের মা।

গত ডিসেম্বরে নরওয়ের আরেক দত্তক শিশু এলিজাবেথ ফিরোজার ৫০ বছর পর মাকে খুঁজে পাবার ঘটনা তাকে উৎসাহিত করে বাংলাদেশে আসতে। শুরু হয় তার এ অনুসন্ধান, নরওয়ে থেকেই এলিজাবেথের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন একাত্তর টিভির সাথে।
এলিজাবেথ ফিরোজা ফাজালসেট বলেন, বাংলাদেশে আমার মাকে খুঁজে পাওয়ার ঘটনা নরওয়েতে আলোড়ন তোলে। এ ঘটনা জানার পর সেলিনা বাংলাদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে আমার সাথে বাংলাদেশে আসে।

প্রথমেই সেলিনাকে নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যায় একাত্তর। সেখানে কোনো তথ্য নেই। এরপরের গন্তব্য সমাজসেবা অধিদপ্তরে। খুঁজে বের করা হয় প্রায় পাঁচ দশক পুরোনো দত্তক ফাইল। সেখানে মিললো মায়ের আঙুলের ছাপ। বারবার সেই ছাপ ছুঁয়েই নিজের মায়ের স্পর্শ পাওয়ার চেষ্টা সেলিনার।
সমাজসেবার নথি বলছে, সেলিনার দাদা-দাদি ছিলেন না। বয়স্ক নানা-নানি সেলিনার মা নুরজাহানকে ছোটবেলায় তার মতোই একটি পরিবারের কাছে দিয়ে যান। তারাই তার বিয়ে দেন। তারপর বিদেশে চলে যায় সেই পরিবারটি। নুরজাহানের পায়ের সমস্যা হওয়ায় স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যায়। দুই মাসের সেলিনাকে নিয়ে মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করতে সমস্যা, তাই নিরুপায় হয়ে সেলিনাকে দত্তক দেন তার মা। কিন্তু এরপর নুরজাহানের কী হয়েছে সেই তথ্য নেই সমাজসেবার নথিতে।

ফাইলে থাকা ঠিকানা ধরে আমরা যাই বনানী মডেল টাউন ১ নম্বর রোডের ৩০ নম্বর বাড়িতে। কিন্তু সে সময়ের মালিকের সন্ধান মেলে না। বনানী ক্লাবের সহায়তায় তাদের খুঁজে পেলেও কোনো সূত্র মেলে না। বেশ কয়েকবার সেই বাড়ি আর সড়কে যাওয়ার পর উল্টোদিকের ফুটপাতের চাওয়ালা আলী আশার আলো দেখান।
প্রায় ৫০ বছর ধরে চা বিক্রেতা আলী জানান, এই শহরে সিরাজগঞ্জের তরুনী নূরজাহানের লড়াইয়ের গল্প। আর সে গল্পে আবার স্বপ্ন দেখেন সেলিনা।

আলীর সূত্র ধরে পরের গন্তব্য পাশের কড়াইল বস্তি। কিন্তু প্রতিদিন মানুষ বদলে যাওয়া কড়াইলের বয়স্করা খোঁজ দিতে পারেননি।
এ যাত্রায় মাকে না পেয়ে চলে যেতে হয়েছে সেলিনাকে। কিন্তু যাবার আগে সকবার কাছে অনুরোধে রেখে গেছেন, তার মা বা বাবর কোনো তথ্য কেউ পেলে তা একাত্তর টিভিকে জানাতে।

সেলিনা ক্লোফটেন বলেন, মাকে না পেয়ে মনটা খারাপ। তবে আমি আশাবাদী, মাকে বা তার আত্মীয়কে খুঁজে পাবো। সবার কাছে অনুরোধ, যদি কেউ কিছু জানতে পারেন দয়া করে একাত্তর টিভিকে জানিয়ে দেবেন, সেটি আমার কাছে পৌঁছে যাবে।

এখনই হাল ছাড়ছেন না সেলিনা। জন্মদাত্রীকে খুঁজতে তাই জন্মভূমিতে ফিরবেন বারাবার।
