মিলনায়তনজুড়ে বসেছিল একঝাঁক কচিকাঁচার আনন্দমেলা। শুক্রবারের স্নিগ্ধ বিকেলটি যেন রূপ নিয়েছিল শিশুদের কলকাকলীতে মুখর এক রঙিন প্রজাপতির ডানায়। কেউ নাচছে, কেউ গাইছে, আবার কেউ মঞ্চে দাঁড়িয়ে করছে পাঠাভিনয়। বাদ যায়নি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরাও। তাদের মনোমুগ্ধকর লোকনৃত্য উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের হৃদয় কেড়ে নেয়। ‘শিকড়ের টানে শৈশবের প্রাণে’ স্লোগানে শিশুদের এই মিলনমেলার আয়োজন করেছিল বাতিঘর সাংস্কৃতিক বিদ্যালয়।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচাস্থ কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা মিলনায়তনে এই বর্ণিল উৎসবের আয়োজন করা হয়। বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার ও প্রখ্যাত সাহিত্যিক আখতার হুসেনকে উৎসর্গ করা হয় এবারের উৎসবটি।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসবের সূচনা হয়। এরপর প্রয়াত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার ও সাহিত্যিক আখতার হুসেনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বাতিঘরের শিশুরা উদ্বোধনী নৃত্য ‘ধন্য ধন্য বলি তারে’ ও ‘আমি টাকডুম টাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল’ পরিবেশন করে মিলনায়তনের আবহ জমিয়ে তোলে।

উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিলো শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় নির্মিত ‘মনের কথা’ পাপেট শোর ভিডিও প্রদর্শন। পাপেট শো দেখে শিশুরা যেমন আনন্দ পায়, তেমনি খুব সহজে জাতীয় পতাকা আঁকার কৌশলও শিখে নেয়। পতাকা আঁকার এই পাপেট অংশের মাধ্যমে খুদে মনে দেশপ্রেমের বীজ বপন করা হয়। এ সময় মঞ্চে আসেন পাপেট শোর পরিচিত মুখ ‘পারুল’রূপী তামান্না তিথি। তিনি শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের সৃজনকর্ম ও তার সঙ্গে কাজ করার স্মৃতিচারণ করেন।
১৯৩২ সালে ব্রিটিশ আমলে গুরুসদয় দত্তের প্রবর্তিত ‘ব্রতচারী’ আন্দোলনের মাধ্যমে শিশুদের দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদায় উদ্বুদ্ধ করতে বিশেষ পরিবেশনা নিয়ে আসে বাতিঘরের শিশুরা। জ্ঞানব্রত, শ্রমব্রত, সত্যব্রত, ঐক্যব্রত ও আনন্দব্রতের এই চেতনা ফুটিয়ে তোলে খুদেরা। ব্রতচারীতে অংশ নেয়—মাহদী ইমাম সান্নিধ্য, লামুমা আজরিন, ত্রিবেণী কর নোরা, আনহা আরওয়া, শাহতাজ নূর ফারহান, শাফাকাত হুসাইন সানাফ, রিদিত চৌধুরী স্পর্শ, অমরাবতী হক বিমূর্ত, ওয়ারদাহ বিনতে মুনতাকিম এভলিন, জুনাইরা সিদ্দিকা, উনাইশা সিদ্দিকা, সুলগ্না দাস রাই, রুশাইদ রহমান, জুনাইরা আহসান ও জায়েদ আহসান।
ব্রতচারী পরিবেশনার পর সাহিত্যিক আখতার হুসেনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শিশুদের উদ্দেশ্যে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক।
এরপর মঞ্চে আসে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের অমর সৃষ্টি ‘মালঞ্চ ও মাধব’ নাটকের পাঠাভিনয়। এতে অংশ নিয়ে সাবলীল অভিনয়ে মুগ্ধতা ছড়ায় নুসাইর বিন মাহতাব, অয়ন্তিকা কর, আরিশ ইবনে আব্দুল্লাহ, রায়াজ ফাউজান নিহান, সুবাইতা সামহা, কাওনাইন রেজা আরাফ, আরহাম রেজা আরিশ, সৈয়দা সামরীন নূর জাইভীসহ অন্য খুদে শিল্পীরা।
উৎসবে বিশেষ চমক নিয়ে হাজির হয় ‘কিডি সিটি স্পেশাল স্কুল এন্ড থেরাপি সেন্টার’এর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা। এ এস এম উজ্জ্বল মণ্ডলের পরিচালনায় তাদের পরিবেশিত লোকনৃত্য পুরো মিলনায়তনজুড়ে এক আবেগঘন ও মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে দেয়। নৃত্যে অংশ নেয় মাইমুন আরাবি, সাফিন আহমেদ, মুপ্তাসিন হাসান সাইয়ান, জুবাইদা খান জারা, নাবিল মাহমুদ, আরহা হক মেহেজা, মেহেরান আবদুল্লাহ ও মার্জুক আহমেদ।
শিশুদের পরিবেশনার পাশাপাশি বাতিঘরের শিক্ষাকর্মীরা পরিবেশন করেন ‘বাংলার পথে সুরের সাথে’ শীর্ষক একটি মনোজ্ঞ নৃত্যালেখ্য। এতে অংশ নেন শ্রাবন্তী পাল তন্বী, সাবিহা সুলতানা শিমু, আমির হামজা, সিনথিয়া নূর জান্নাতসহ বাতিঘরের একদল নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী।
বাতিঘরের পরিচালক মরিয়ম ইউসুফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কমিশনার অরুণ কুমার বিশ্বাস এবং গল্পকথক ও আবৃত্তিশিল্পী তামান্না তিথি। বক্তারা শিশুদের মানসিক বিকাশ ও সাংস্কৃতিক চর্চায় এমন আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
শিল্পীত মানুষ গড়ার প্রত্যয় আর শিশুদের প্রাণবন্ত হাসিতে মোড়ানো এই উৎসব শেষ হয় আগামী দিনে আরও সুন্দর শৈশবের প্রত্যাশা নিয়ে।
