মানসিক ভারসাম্যহীন শিকলে বাঁধা মা, খালা ও নানীকে নিয়ে এ ঘরেই থাকতো ১১ বছরের রুবিনা। পলিথিন ও তালপাতায় ঘেরা ঘরটি এখন ভেঙ্গে গেছে। এখনো দিনরাত শিকলে বাঁধা থাকে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকতে থাকা রুবিনার মা। একাত্তর টিভিতে রুবিনাদের মানবেতর জীবনযাপন নিয়ে প্রতিবেদন প্রচারের পর প্রধানমস্ত্রীর উপহারের নতুন ঘর পেয়েছে রুবিনা।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে ঈদের আগের দিন (২ মে) অসুস্থ্য মা, খালা ও নানীকে নিয়ে সেই নতুন পাকা ঘরে ওঠেছে রুবিনা। নিজের নতুন ঘর, খাট, পড়ার টেবিল পেয়ে রুবিনা এবার নতুনভাবে ঈদ উদযাপন করলেও তার চোখের জল ঝরছে শিকলে বাঁধা মায়ের মুখটি দেখে। মাকে কবে চিকিৎসা করাতে পারবেন এ চিন্তায় ছোট্ট রুবিনার গায়ের নতুন জামাটিও ভিজে গেছে চোখের জলে। তবে এ পরিবারের সবসময় পাশে থাকা এবং সব ধরণের সহায়তার আশ্বাস দিলেন উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান।
রুবিনা পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। জন্মের পর থেকে নিরুদ্দেশ বাবার মুখ দেখেনই সে। তালপাতা ও পলিথিনে ঘেরা ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে রুবিনার কেটেছে ১১ বছর।
স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তার মা ডলি বেগম মানসিক ভারসাম্যহীন। তাই তাকে পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়। আর খালা ফাতেমা বেগমও মানসিক ভারসাম্যহীন। বৃদ্ধ নানী আছিয়া বেগমের সাথে কখনো ভিক্ষে করে, অন্যের বাসা থেকে খাদ্য সহায়তা পেয়ে ছোট্ট রুবিনা বেড়ে ওঠা।
রুবিনার এ কষ্টের মানবেতর জীবনযাপনের করুন চিত্র নিয়ে ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে একাত্তর টিভিতে প্রতিবেদন প্রচারের পর তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে উপজেলা প্রশাসন। প্রধানমন্ত্রীর উপহারের একটি ঘর দেয়া হয় রুবিনাকে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা নিয়ে রুবিনার পাশে দাড়ায় মানুষ।
এই ঈদে নিজের শৈশবের ভিটা ছেড়ে মাকে সাজিয়ে শিকলে বাঁধা অবস্থায়ই রুবিনা নতুন ঘরে রওনা হয়। জীর্ণ ঘর ছেড়ে পাকা ঘরের যাত্রায় মায়ের পায়ে বাঁধা ছিলো এই পুরনো শিকল।
নতুন ঘরের তালা খুলে ঘরে প্রবেশ করে রুবিনা যখন মাকে নতুন খাটের উপর বসিয়ে খাটের পায়ার সাথে শিকল দিয়ে যখন তার মাকে বাঁধছিলো, তখন কিছুটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে রুবিনা। পিঠে তখনো তার স্কুল ব্যাগ।
নতুন পড়ার টেবিলে বই সাজাতে সাজাতে রুবিনা জানায়, জীবনে এই প্রথম নিজেদের পাকা ঘরে ঈদ করবেন। এতোদিন মাটিতে চট বিছিয়ে পড়লেও এখন টেবিল চেয়ারে বসে পড়তে পারবেন। কিন্তু কস্ট হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী একটি ঘর ঠিকই দিয়েছে কিন্তু মা ও খালার চিকিৎসা করাতে এখনো পারিনি। তার স্বপ্ন পড়ালেখা করে বড় চাকুরী করবেন। তার মতো কষ্টে থাকা মানুষের পাশে দাড়াবেন। রুবিনার একটাই প্রার্থনা কারো মা যাতে তার মায়ের মতো শিকলে বাঁধা জীবন যাপন করতে না হয়।
রুবিনার নানী আছিয়া বেগম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাদের একটি ঘর দিয়েছে এতে আমরা খুবই খুশি। কিস্তু কষ্ট দুই পাগলকে নিয়ে। ছোট নাতনীকে নিয়ে আর কতোদিন তাদের বাঁচাতে পারবো তা জানি না। ওদের চিকিৎসা করাতে পারলে হয়তো সুস্থ্য হতো।
রুবিনার স্কুল শিক্ষক ও প্রতিবেশীরা জানান, রুবিনা খুবই মেধাবী মেয়ে। ওকে যদি ঠিক মতো গাইড করা হয় তাহলে সে ভবিষ্যতে অনেক বড় হবে। তবে এখন দরকার তার মায়ের চিকিৎসা। ছোট্ট এ মেয়েটি এ পরিবারের দুইজন পাগল ও বৃদ্ধ নানীকে সামলাচ্ছে।
কলাপাড়া উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শাহীনা পারভীন সীমা বলেন, রুবিনার পরিবারের দুরাবস্থা থেকে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর দেয়া হয়েছে। এখন বিদ্যুত দরকার এ ঘরে।
মুজিবশতবর্ষ উপলক্ষ্যে কলাপাড়ায় প্রথম পর্যায়ে ৪৫০ পরিবার, দ্বিতীয় পর্যায়ে ১১০ পরিবার ও তৃতীয় ধাপে ১২০ পরিবার প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পেয়েছেন। রুবিনার মতো এসব পরিবার প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পেয়ে সবাই আজ খুশি।
একাত্তর/এসএ
