সিরাজগঞ্জে নানা আয়োজনে কারাম উৎসব উদযাপন করেছে সমতলের আদিবাসীরা। প্রকৃতি বন্দনায় বংশপরম্পরায় ভাদ্র মাসে তারা এই উৎসব উদযাপন করে।
তাদের বিশ্বাস, প্রকৃতি সন্তুষ্ট থাকলে বাঁচবে জীবন। উৎসবকে ঘিরে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মুখর ছিলো সেখানকার আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলো।
বর্ষায় ধান রোপণের পর আদিবাসী সম্প্রদায়ের অফুরন্ত অবসর। ঠিক সেই ভাদ্র মাসে আসে আদিবাসী সম্প্রদায়ের অন্যতম বার্ষিক উৎসব কারাম। বৃক্ষের পূজার উৎসব।
মূলত সমতলের আদিবাসী মাহাতো, সাঁওতাল, ওরাঁও, বড়াইক, কুর্মি, মাহালিসহ বিভিন্ন সম্প্রদায় ভাদ্র মাসে কারাম উৎসব পালন করে।
খোলা মাঠে বা বাড়ির উঠানে কারাম গাছের ডাল পুঁতে শুরু হয় উৎসবের। ফুল দিয়ে সাজিয়ে, মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে সারাদিন ধরে চলে নানা আয়োজন। এতে অংশ নেয় সব বয়সী মানুষ।
কারাম উৎসব উদযাপনের জন্য আদিবাসী নর-নারী সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পূজার প্রথম দিন উপোস থাকেন। উপোসের মধ্য দিয়ে কারাম পূজা শুরু করেন ওঁরাও নারীরা।
পরে মাদল, ঢোল, করতাল ও ঝুমকির বাজনার তালে তালে নেচে-গেয়ে এলাকা থেকে কারামগাছের (খিল কদম) ডাল তুলে আনেন।
এরপর তাঁরা একটি পূজার বেদি নির্মাণ করেন। সূর্যের আলো পশ্চিমে হেলে গেলে সেই কারামগাছের ডালটি পূজার বেদিতে রোপণ করা হয়।
পুরোহিত উৎসবের আলোকে ধর্মীয় কাহিনী শোনান। সেই সঙ্গে চলে কাহিনীর অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা। ব্যাখ্যা শেষ হলে বেদির চারধারে ঘুরে ঘুরে তরুণ-তরুণীরা নাচতে থাকেন।
পুরোহিতের ধর্মীয় কাহিনী পাঠ শেষ হওয়ার পর উপোস থাকা মেয়েরা পরস্পরকে খাবারে আমন্ত্রণ জানিয়ে উপোস ভেঙে ফেলেন।
এর পরই বিভিন্ন বাড়ি থেকে পাওয়া চাল, ডাল ও টাকা দিয়ে ভূরিভোজের আয়োজন করা হয় আমন্ত্রিত অতিথি ও আত্মীয়স্বজনদের।
শেষে ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে স্থানীয় নদীতে কারামের ডালটি বিসর্জনের মাধ্যমে কারাম উৎসব আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়
কারাম উৎসবে বিভিন্ন আচার, অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি বন্দনা করা হয়। তাদের বিশ্বাস, প্রকৃতি বাঁচলে, বাঁচবে জীবন। পূজা শেষে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে মেতে ওঠেন ঝুমুর নাচে।
এখন এই উৎসবের অংশ হচ্ছেন বাঙালীরাও। উৎসবের আয়োজক জানান, তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলায় এখন মাত্র আটটি কারাম গাছ রয়েছে। তাই গাছটি সংরক্ষণ করা দরকার।
আরও পড়ুন: ছেলেদের পড়ালেখা করিয়ে এসএসসি দিচ্ছেন বাবা
কারাম গাছের ডাল কেটে এই উৎসব কোথাও কোথাও ডাল পূজা নামেও পরিচিত। ডাল অস্থায়ী মণ্ডপে পুঁতে রেখে পূজা-অর্চনা আর নাচ-গান ও গল্প বলার মধ্য দিয়ে এই উৎসব শুরু হয়।
কারাম উৎসবে মূলত বীজের অঙ্কুরোদগম, বীজ থেকে চারা তৈরি, সন্তানস্নেহে লালন-পালন ও সংরক্ষণ প্রতীকী অর্থে প্রকৃতিকেই বন্দনা করা হয়।
একাত্তর/এসজে
