হরহামেশাই খবর আসে সুন্দরবনের বাঘ লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। বন সংশ্লিষ্টদের মতে, গত ১৫ বছরে অন্তত অর্ধশত বার এমন ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। এর বাইরে কত বাঘ এসেছে-গেছে তার হিসাব দেওয়া অবশ্য মুশকিল। লোকালয়ে বাঘের এমন উপস্থিতিতে মানুষ ও বাঘের লড়াই ঘটেছে বহুবার। এতে প্রাণ গেছে মানুষের, সঙ্গে বাঘেরও।
বনের বাঘ কেন বার বার লোকালয়ে এমন প্রশ্নে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, এখানে দুটি ব্যাপারে আছে। তার একটি আনন্দের, অন্যটি আতঙ্কের। আতঙ্কের ব্যাপারটি হলো- বনের বাঘ লোকালয়ে আসা। আর আনন্দেরটি হলো- তাহলে বনে বাঘের সংখ্যা বাড়ছে।
তিনি জানান, বাঘ সুন্দরবনের হোমরেঞ্জ এলাকায় বসবাস করে। সম্প্রতি হয়তো দুটি বাঘ ঘুরতে ঘুরতে ভোলা নদী পাড়ি দিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। এমনকি সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় আগের চেয়ে বাঘের বিচরণ অনেকটা বেশি দেখা যাচ্ছে। ধারনা করা হচ্ছে- সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রের দাবি, সুন্দরবনে চোরা শিকারীদের তৎপরতার কারণে অনেক সময় বাঘ, হরিণসহ বন্যপ্রাণী সুন্দরবন ছেড়ে লোকলয়ে চলে আসে।

কেমন আছে সুন্দরবন, কেমন আছে বাঘেরা
সুন্দরবনের মোট আয়তন ছয় হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার। এর মধ্যে স্থলভাগের পরিমাণ চার হাজার ১৪৩ বর্গ কিলোমিটার। বর্তমানে সুন্দরবনের মোট আয়তনের অর্ধেকেরও বেশি এলাকা সংরক্ষিত বনাঞ্চল। আর গোটা সুন্দরবন জুড়েই রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার কম-বেশি বিচরণ।
এদিকে চোরা শিকারিদের তৎপরতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরবনে বাঘ হুমকির মুখে রয়েছে। সর্বশেষ ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে জরিপে সুন্দরবনে বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা ১১৪টি নির্ধারণ করা হয়। তবে নতুন করে বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ করতে সুন্দরবনে ক্যামেরা ট্র্যাপিংযের মাধ্যমে বাঘ গণনার কাজ চলছে।
বন বিভাগের তথ্য মতে, ২০০১ সাল থেকে ২০২২ সালের এ পর্যন্ত সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে নানাভাবে ২৮টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুষ্কৃতিকারীদের হাতে ১৪টি, জনতার হাতে গণপিটুনিতে পাঁচটি, স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে আটটি এবং ঘূর্ণিঝড় সিডরে একটি বাঘ মারা গেছে। চামড়া উদ্ধার করা হয়েছে ১৯টি। সুন্দরবন বিভাগ, র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা কখনও যৌথ আবার কখনও আলাদা অভিযান চালিয়ে চোরা শিকারিচক্রের কবল থেকে বাঘের চামড়া ও হাড়গোড় উদ্ধার করে। আবার সুন্দরবন থেকে মৃত অবস্থায় বাঘ উদ্ধার করে বন বিভাগ।

সবশেষে, বুধবার গভীর রাতে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় দুটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতির প্রমাণ পায় গ্রামবাসী। সকালে উঠে দুটি বাঘের পায়ের ছাপ দেখে তারা বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এমন ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পাশের অন্তত ছয়টি গ্রামে।
আরও পড়ুন: বনের দুই বাঘ লোকালয়ে, কয়েক গ্রামে আতঙ্ক
পরে সংশ্লিষ্টরা ঘটনা স্থলে উপস্থিত হয়েও বিষয়টি নিশ্চিত হন। এরপর গ্রামবাসীদের সতর্ক থাকতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তারপর বন সংশ্লিষ্টরা বাঘের পায়ের চিহ্ন পর্যবেক্ষণ করে ধারনা করেন বাঘটি আবারও বনে ফিরে গেছে।
এদিকে গ্রামবাসীর দাবি, সুন্দরবন সংলগ্ন ভোলা নদী পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। তাই বাঘ সহ অন্য বন্যপ্রাণি হরহামেশাই নদী পেরিয়ে লোকালয়ে চলে আসছে। ঘটছে পশু ও মানুষের সংঘর্ষ, সঙ্গে প্রাণহানি।
একাত্তর/এসি
