কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশের অন্যতম বড় ঈদ জামাত। জামাতে লাখো মুসুল্লির আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে মুখরিত হয় নরসুন্দা পাড়ের এ ময়দান।
সকাল ১০টায় ঈদগাহ ময়দানের রেওয়াজ অনুযায়ী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাসেল শেখ বন্দুকের গুলি ছুঁড়ে জামাত শুরুর নির্দেশ দেন।
বিশাল মাঠে লাখো মুসল্লির মনোযোগ আকর্ষণ করতে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে গুলি ছোড়ার রেওয়াজ রয়েছে শুরু থেকেই।
এদিন একাধিক দফায় পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়েন পুলিশ সুপার। সর্বশেষ গুলি ছোড়ার এক মিনিট পর শুরু হয় ঈদ জামাত।
১৯৬ তম ঈদুল ফিতরের জামাতে অন্তত পাঁচ লক্ষাধিক মুসুল্লি অংশ নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইমামতি করেন বাংলাদেশ ইসলাহুল মুসলেমিন পরিষদের চেয়ারম্যান আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ।
মোনাজাতে তিনি দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি এবং সমৃদ্ধি কামনা করে মোনাজাত করেন। এ সময় লাখো লাখো মুসুল্লি আমিন আমিন আমিন বলে ধ্বনি তোলেন।

কিশোরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মাহমুদ পারভেজ দাবি করেছেন, এবারের ঈদ জামাতে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন।
প্রায় ২০০ বছরের পুরনো এ ঈদগাহ ময়দানে ঈদুল ফিতরের জামাতে অংশ নিতে ভোর থেকে দেশ বিদেশের লাখো মুসুল্লি দলে দলে ময়দানের দিকে আসতে থাকেন।
নিরাপত্তার স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাসির পর আর্চওয়ের ভিতর দিয়ে প্রতিটি মুসুল্লিকে ময়দানে প্রবেশ করান।
সকাল আটটার মধ্যেই পুরো ঈদগাহ ময়দান কানায় কানায় ভরে যায়। ময়দানে জায়গা না পেয়ে মুসল্লিরা আশপাশের বাসার ছাদে, কিশোরগঞ্জ- করিমগঞ্জ সড়ক, কিশোরগঞ্জ-চামড়া নৌ বন্দর সড়কে নামাজ আদায় করেন।
উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঈদ জামাতের আয়োজনে নেয়া হয়েছিল সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার থেকে র্যাব ও পুলিশের সদস্যরা বাইনোকুলারের সাহায্যে পুরো ময়দান পর্যবেক্ষণ করেন।
চারটি ড্রোন ক্যামেরা ও প্রশাসনের নিজস্ব ক্যামেরা দিয়ে শোলাকিয়া ময়দান ও আশপাশ এলাকায় নজরদারি করা হয়। পাঁচ প্লাটুন বিজিবি, কয়েকশত র্যাব সদস্য, পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়নসহ কয়েক হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ময়দানের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিল।
সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিলেন। প্রস্তুত রাখা হয়েছিল বোম্ব ডিসপোজাল টিম ও পুলিশের কুইক রেসপন্স টিমের সদস্যদের।
শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে লাখো লাখো মুসল্লি একসাথে ঈদের নামাজ পড়লে দোয়া কবুল হয়, এমন জনশ্রুতি থেকে শোলাকিয়া ময়দানে দিন দিন মুসুল্লির সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
দেশ-বিদেশের মুসুল্লিদের পদভারে মুখরিত হচ্ছে ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দান। তবে কড়া নিরাপত্তার কারণে মুসল্লিরা কিছুটা সমস্যায় পড়লেও তারা সেটা মেনে নিয়েছেন।
২০১৬ সালে ৭ জুলাই ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে শোলাকিয়া ময়দানের কাছেই পুলিশ চেকপোস্টে জঙ্গিরা বোমা হামলা চালিয়েছিল। এতে দুই পুলিশসহ এক নারী ও এক জঙ্গি নিহত হয়। এরপর থেকেই শোলাকিয়া ময়দানকে ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাসেল শেখ জানান, ২০১৬ সালের জঙ্গি হামলার বিষয়টি মাথায় রেখেই পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। লাখো মুসুল্লির একসাথে ঈদ জামাতকে উৎসবমুখর ও নির্বিঘ্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সচেষ্ট ছিল।

তিনি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঈদ জামাত আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
আরও পড়ুন: দিনাজপুরের গোর-এ শহীদ ময়দানে নামাজ পড়লেন কয়েক লাখ মুসল্লি
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ শামীম আলম বলেন. ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দানে ১৯৬তম ঈদুল ফিতরের জামাত শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে পেরে তিনি আনন্দিত। সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তা সম্ভব হয়েছে। তিনি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সকল সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সকল মুসুল্লিকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
১৮২৮ সালে এই ময়দানে সোয়া লাখ মুসুল্লি এক সাথে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেছিল। সেই সোয়া লাখ থেকে কালের বিবর্তনে শোলাকিয়া হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
একাত্তর/আরবি
