রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অমর কালজয়ী সৃষ্টিতেই চিরস্মরণীয়, বরণীয় ও শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত। তাঁর গান, কবিতা ও নাটক কালের সীমা অতিক্রম করে যুগের পর যুগ জেগে রয়েছে কোটি বাঙালির হৃদয়ে। তাই বিশ্বকবির ছবিতে কালি লেপনের মতো ধৃষ্টতাপূর্ণ ঘটনার প্রতিবাদে কোনো অরাজকতা নয়, সুর ও কবিতার শক্তিতেই জানানো হলো অনন্য সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ।
শুক্রবার বিকেলে কক্সবাজার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জেলার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগে ‘শতকণ্ঠে রবীন্দ্র-নজরুল’ শিরোনামে এক প্রতিবাদী সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে উৎসবমুখর কিন্তু প্রতিবাদী এই আয়োজনের সূচনা হয়। এরপর উপস্থিত শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী গান ‘সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরই অপমান’ এবং কাজী নজরুল ইসলামের ‘দাও শৌর্য, দাও ধৈর্য, হে উদার নাথ, দাও প্রাণ’ পরিবেশন করেন। সুরের মূর্ছনার পাশাপাশি আবৃত্তি করা হয় স্বরচিত ও বিখ্যাত সব কবিতা।
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ঝিনুকমালা খেলাঘর আসরের সভাপতি আশরাফুল হুদা সিদ্দিকী জামশেদ বলেন, বিশ্বকবির ছবিতে কালি লেপে কবির মর্যাদা বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন করা যায় না, বরং এমন কাজ যারা করেছে এটি তাদের নিজেদেরই চরম মানসিক দেউলিয়াত্ব ও অপমান। এই চক্রটি মূলত সমাজ ও দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়, তবে রবীন্দ্রনাথের অনুরাগীরা সুরের শক্তিতেই এই অসুর শক্তিকে প্রতিহত করবে।
উদীচী কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক সৌরভ দেব এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বলেন, এই ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের স্রেফ কারাদণ্ড দেওয়া সমাধান নয়, বরং তাদের রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সৃষ্টি পড়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। কারণ তারা না বুঝেই এই অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে। শিল্প, সাহিত্য ও কবিতা সীমান্তের কাঁটাতারে বন্দী থাকে না, মুক্ত পাখির মতো উড়ে বেড়ায়। যারা এটি গ্রহণ করতে পারে না, সেটি তাদের নিজস্ব মননশীলতারই সীমাবদ্ধতা।
সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক মনিবর মোবারক ও জেলা খেলাঘরের সভাপতি সুবিমল পাল পান্না বলেন, মননে তীব্র সাম্প্রদায়িকতা বাসা বাঁধলে এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তিগুলো ভিন্ন কৌশলে হাজির হলে এ ধরনের মূর্খতার প্রকাশ ঘটে। তবে কালি লেপে কোনো মহান সৃষ্টিকে কখনো ধ্বংস করা যায় না।
উল্লেখ্য, গত ১০ অক্টোবর রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার সময় চারজনকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশ। ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অসহিষ্ণুতা ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করতেই কক্সবাজারের এই সুশীল আয়োজকেরা সুরের ধারায় প্রতিবাদ জানালেন।
