ভারতের রাজধানী দিল্লির কনট প্লেসে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) পূর্বঘোষিত ‘লেহরা দো তেরঙ্গা’ মার্চকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ব্যাপক হাতাহাতি, সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরাসহ অন্তত এক ডজন বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ। পালিকা বাজারের ২ নম্বর গেটের কাছে বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, নিরাপত্তা কর্মীরা তাদের হাত থেকে জাতীয় পতাকা কেড়ে নিয়ে তা ছিঁড়ে ফেলেছেন। এ সময় অনেক পুলিশ অফিসারের গায়ে কোনো নেমপ্লেট ছিল না বলেও প্রশ্ন তোলেন আন্দোলনকারীরা।

কনট প্লেস ও তার আশপাশের এলাকায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে প্রায় দুই হাজার জমায়েত হওয়া মানুষকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ব্যারিকেড ও অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করে। এর আগেই পুলিশ সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দীপকেকে (যিনি কেরল বাগের একটি বাড়িতে অবস্থান করছিলেন) নোটিশ দিয়ে এই মিছিল বাতিল করার নির্দেশ দেয়। তবে নোটিশ গ্রহণ করলেও কর্মসূচি বাতিল করতে অস্বীকৃতি জানান দীপকে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, আমরা যদি ১০০টি স্থানে কর্মসূচির ঘোষণা দিই, তবে নরেন্দ্র মোদী কি ১০০টি স্থানই বন্ধ করে দেবেন? জাতীয় পতাকা ওড়াতে দিল্লি পুলিশের এত সমস্যা কিসের?

মূলত ভোটার তালিকা সংশোধনে (এসআইআর) ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে আসছিল সিজেপি। এর আগে যন্তর মন্তরে প্রবেশ করে জাতীয় পতাকা উঁচিয়ে স্লোগান দেওয়ার অপরাধে দলের দুই শীর্ষ নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে ৫ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠায় আদালত। তাঁদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদেই এই জাতীয় পতাকা মিছিলের ডাক দেওয়া হয়েছিল।

মিছিলটি ঘিরে দিল্লির কনট প্লেস, মান্ডি হাউসসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সিপিআই(এম) সংসদ সদস্য জন ব্রিটাসের নেতৃত্বে এসএফআই-এর একটি পদযাত্রা কনট প্লেসে পৌঁছায়। অপরদিকে মান্ডি হাউসে আইসার ছাত্রনেতারা সিইসি’র পদত্যাগ, এসআইআর বাতিল এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন প্রত্যাহারের দাবিতে ফ্লাশ প্রটেস্ট বা ঝটিকা মিছিল করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিউ দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল (এনডিএমসি) সেন্ট্রাল পার্ক ১৬ ও ১৭ অক্টোবর সাধারণের জন্য পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করে।

অভিজিৎ দিপকেকে আটকের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল সামাজিক মাধ্যমে এক বার্তায় বলেন, ভারতে জাতীয় পতাকা ওড়ানো কি এখন অপরাধ? যাদের জাতীয় পতাকা নিয়ে সমস্যা রয়েছে, তাদের পাকিস্তানে চলে যাওয়া উচিত। তিনি এই আটক অভিযানকে স্বৈরাচারী পদক্ষেপ আখ্যা দিয়ে বলেন, বিক্ষোভকারীদের দেখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কতটা ভীত, এটি তারই প্রমাণ।

দিল্লির এই উত্তাপের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণ ভারতেও। দিল্লিতে সিজেপির কর্মসূচির সমর্থনে বেঙ্গালুরুর টাউন হল এলাকায় শর্তসাপেক্ষে একটি তেরঙ্গা মিছিলের অনুমতি দেয় স্থানীয় পুলিশ। অন্যদিকে, তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ে ডিএমকে সংসদ সদস্য কানিমোঝি করুণানিধি হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রাজপথে আন্দোলনে যোগ দেন।

তিনি অভিযোগ করেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে দেশজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি এবং তামিলনাড়ুতে প্রায় ৭৪ লাখ ভোটারের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। যতক্ষণ না পর্যন্ত বঞ্চিত ভোটারদের নাম পুনর্বহাল করা হচ্ছে এবং সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণ করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।

অন্যদিকে, মুম্বাইয়ের আজাদ ময়দান ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছোট ছোট প্রতিনিধি দল প্রতিবাদ সভা করেছে। সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে মূলত মুম্বাই থেকে বিমানে দিল্লি পৌঁছানোর পরেই প্রথম দফায় আটক হয়েছিলেন। ফলে মুম্বাই পুলিশ আজাদ ময়দান ও সিএসএমটি স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় কড়া নজরদারি ও নিরাপত্তা বাড়ায়, যাতে অনুমতি ছাড়া কোনো বড় মিছিল বের হতে না পারে।

সব মিলিয়ে দিল্লির কনট প্লেস ও যন্তর মন্তরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই আন্দোলন একটি নির্দিষ্ট শহর বা রাজনৈতিক দলে সীমাবদ্ধ নেই। মুম্বাই বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ের মতো বড় শহরগুলোতে এটি এখন ভোটাধিকার রক্ষা ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে যৌথ নাগরিক আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে।
