কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৩) ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ভাড়া করা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বাসায় ফেরার পথে চালকের নির্মমতার শিকার হয় ওই কিশোরী। এ ঘটনায় জড়িত অভিযুক্ত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে (৩৫) চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পংকজ বড়ুয়া।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন ওই কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহতের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত আট অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর উত্তরপাড়া গ্রামের একটি ধানক্ষেতের আইলের পাশে এক কিশোরীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করা হয়। খবর পেয়ে লালমাই থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার ও পরিচয় শনাক্তের কাজ শুরু করে। পরে নিহতের বাবা এসে মরদেহটি শনাক্ত করেন।
নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর জেলার বাসিন্দা। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারটি কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করতো। তাজমিন নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিরো।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পংকজ বড়ুয়া জানান, গত আট অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিন পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে নগরীর রেসকোর্সের বাসার উদ্দেশ্যে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে। চালক সুমন মিয়ার সঙ্গে ৩০০ টাকায় ভাড়া ঠিক হয়। অটোরিকশায় ওঠার পর কিছু দূর গিয়ে তাজমিন চালককে ১০০ টাকা দিয়ে কলা ও রুটি কিনে আনে।
এরপর ‘শর্টকাট’ পথে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে চালক সুমন মিয়া নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে ইউটার্ন নিয়ে চাঁদপুরগামী সড়ক ধরে লাকসাম উপজেলার বিজরা বাজার হয়ে অন্যদিকে চলে যায়। একপর্যায়ে অটোরিকশাটি একটি নির্জন ও অন্ধকার স্থানে থামায় সে। জায়গাটি রেসকোর্স এলাকা নয় বুঝতে পেরে তাজমিন ভীত হয়ে চালকের কাছে জানতে চায় তাকে কোথায় আনা হয়েছে। তখন সুমন তাকে জানায়, এটি রেসকোর্স নয়, অন্য জায়গা।
পুলিশের ভাষ্যমতে, ওই সময় তাজমিন অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করলে সুমন তাকে আটকায় এবং ধর্ষণের চেষ্টা করে। কিশোরী চিৎকার শুরু করলে সুমন তার গামছা গলায় পেঁচিয়ে ধরে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাজমিন দুর্বল হয়ে পড়ে।
জিজ্ঞাসাবাদের বরাত পুলিশ জানায়, সুমন তাজমিনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে। পরবর্তীতে তাকে ধানক্ষেতে নিয়ে উপুড় করে শুইয়ে পা দিয়ে মাথা চেপে ধরে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর তাজমিনের হাতব্যাগ থেকে আইফোনটি নিয়ে ব্যাগটি ধানক্ষেতেই ফেলে রেখে অটোরিকশা নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে সে।

পুলিশ আরও জানায়, ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর সুমন স্থানীয় কাচিকাটা মসজিদের সামনের একটি পুকুরে গোসল করে। পরে ভাড়ায় চালিত আরেকটি সিএনজিতে করে বাখরাবাদ এলাকায় যায় এবং সেখানে একটি পুকুরপাড়ের জঙ্গলে তাজমিনের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া আইফোনটি লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামে পালিয়ে যায়।
পরদিন শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও লালমাই থানা পুলিশ। পরে তার দেওয়া তথ্য ও দেখানো স্থান অনুযায়ী বাখরাবাদ এলাকার পুকুরপাড়ের জঙ্গল থেকে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় নিহত স্কুলছাত্রীর বাবা বাদি হয়ে লালমাই থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। গ্রেপ্তার আসামির বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সাংবাদিক সম্মেলনে লালমাই থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মিজানসহ জেলা পুলিশের বিভিন্ন স্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
