মাদারীপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র সমর্থক এসকেন্দার আলী খাঁ’র খুন হওয়া নিয়ে ঈগলের প্রার্থী অভিযোগ তুলেছেন, ভোটে ভীতি ও ত্রাস সৃষ্টি করতেই নৌকার কর্মী-সমর্থকরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
আর নৌকার প্রার্থীর অভিযোগ, এসকেন্দার পারিবারিক বিরোধে খুন হলেও সরকার ও আওয়ামী লীগকে বিতর্কিত করতেই তার কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে বানোয়াট অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
শনিবার ভোরে কালকিনির রায়পুর ভাটবালী গ্রামে এসকেন্দারের ওপর হামলা করা হয়। তাকে পিটিয়ে, কুপিয়ে জখম করাসহ দুই পায়ের রগও কেটে ফেলা হয়।
গুরুতর আহত অবস্থায় এসকেন্দারকে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে দুপুরে সেখানই তিনি মারা যান।
এসকেন্দারের হত্যার ঘটনা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন মাদারীপুর-৩ আসনে ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাহমিনা সিদ্দিকী। তিনি কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য।
এরপরই সংবাদ সম্মেলন করেন একই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও নৌকার প্রার্থী আবদুস সোবহান গোলাপ। তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক।

এসকেন্দারের মৃত্যুর জন্য নৌকার সমর্থকদের সরাসরি দায়ী করে ঈগলের নির্বাচনী পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তৌফিকুজ্জামান শাহীন।
ঈগল সমর্থকের মৃত্যুর প্রতিবাদে কালকিনিতে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। সেখানে নৌকার সমর্থকদের দায়ী করে স্লোগান দেওয়া হয়।
স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থককে হত্যা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকের মৃত্যুর ঘটনায় রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। তা পেলেই কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
যা বলছেন তাহমিনা সিদ্দিকী
সংবাদ সম্মেলনে তাহমিনা বলেন, এসকান্দার খাঁ আট নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য। উনি আমার নির্বাচন করছেন। এজন্য তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
‘এ জন্য আমিও শঙ্কিত, ওখানকার ভোটাররাও শঙ্কিত। ভোটের প্রচারণায় তারা আর নামতে সাহস পাবে কিনা, এটা নিয়েও আমি শঙ্কা বোধ করছি।’

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোটের উৎসাহ দেওয়ার বিষয় উল্লেখ করে তাহমিনা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনা যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে এখানে।
‘যিনি নৌকার প্রার্থী, তিনি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশ না সম্পাদকের দায়িত্বে। কিন্তু আজকে তার কর্মী-সমর্থকরা যা ঘটালো, এ নিয়ে তার কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই, পদক্ষেপও নেই। ওই পরিবারকে তিনি কোনো সান্ত্বনা দিতে যান নাই, বা বিষয়টা দেখবেন বলেও আশ্বস্ত করেননি।’
স্বতন্ত্র প্রার্থী তাহমিনা বলেন, ‘কাজেই আমার মনে হয়, এটা নির্বাচন কেন্দ্রিক এবং উল্টো আরো ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। আমার মনে হয়, আমার পক্ষে কোনো প্রচারণা চালাতে না সেজন্য এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে।
‘আমি এই হত্যার কঠিন বিচার চাই। আইনগত বিচার চাই। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চাই, যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণামতে, প্রত্যেকের ভোট প্রত্যেকে যেন দিতে পারে এবং সঠিকভাবে নির্বাচনের ফলাফল যেন প্রকাশিত হয়।’
যা বলছেন আবদুস সোবহান গোলাপ
এসকেন্দার খাঁ খুন হওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও মাদারীপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুস সোবহান গোলাপ বলেন, ‘আপনারা যা জানেন, আমি তাই জানি। আপনারা যেভাবে শুনেছেন, আমি সেভাবেই শুনেছি।’

তাহমিনা সিদ্দিকীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মানতেও চান না গোলাপ। তিনি বলেন, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী আপনারা বলেন। আমিতো স্বতন্ত্র প্রার্থী বলি না, বিদ্রোহী প্রার্থী বলি। সে আওয়ামী লীগের উপজেলা সভাপতি। সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি। সে কীভাবে স্বতন্ত্র প্রার্থী।’
খুনের কারণ হিসেবে গোলাপ বলেন, ‘আপন চাচা-ভাতিজা দ্বন্দ্ব, জমিজমা নিয়ে বহুদিন আগে থেকেই। এটা নতুন কিছু না। দীর্ঘদিন ধরেই এই জমিজমা নিয়ে গণ্ডগোল হচ্ছে, বিরোধ হচ্ছে। সেই বিরোধের জেরেই আজকে সকালে একইভাবে ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে। এক পর্যায়ে বোধহয় একজন আহত হয়েছেন। আমি শুনতে পেলাম হাসপাতালে একজন মারা গেছেন। মারা গেছেন কিনা, আমি জানি না! আপনাদের মতো আমিও শুনলাম এটা।’
নৌকার প্রার্থীর দাবি, ‘পুরোপুরি জমিজমা-পারিবারিক ব্যাপার এটা। কেউ যদি এটাতে রাজনৈতিক রঙ দেয় যে, স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থককে নৌকা প্রার্থীর সমর্থকরা মারছে, এটা মনে হয় ভিত্তিহীন। এটা অপপ্রচার করছে। এটা কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে চলে যায়।
‘প্রধানমন্ত্রী নৌকার প্রার্থী দিয়েছে। কাজেই ওর (স্বতন্ত্র প্রার্থী) কথা সরকারের বিরুদ্ধে যায়। বিএনপি জামায়াতের ভাষায় ওরা কথা বলে। বিএনপি-জামায়াত যেমন আওয়ামী লীগকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়, এই নির্বাচনকে যেমন কলুষিত করতে চায়, বিভিন্ন আগুন সন্ত্রাস, হত্যাকাণ্ড বা অরাজকতার মধ্য দিয়ে যেভাবে নির্বাচনকে বানচাল করতে চায়, ঠিক একই ভাষায় কথা বলে তাহমিনা সিদ্দিকী। ও নৌকার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী। সে নৌকার প্রার্থীকে বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে। এটা কার বিরুদ্ধে যাচ্ছে?’
ঈগলের প্রার্থীকে উদ্দেশ্য করে আবদুস সোবহান গোলাপ বলেন, ‘তার বোধগম্য হওয়া উচিত, সে আওয়ামী লীগ হিসেবে দাবি করে। কিন্তু কথা বলছে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, নৌকার বিরুদ্ধে, সরকারের বিরুদ্ধে। আমার মনে হয় সে আত্মঘাতী কাজ করছে। এটা থেকে তার বিরত থাকা উচিত।’
পারিবারিক দ্বন্দ্বকে ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে চালানোকে ‘মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও অসত্য’ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এই নেতা। তিনি বলেন আরও বলেন, আমার মনে হয়, (ভোটের) পরিবেশটাকে সে নষ্ট করার চেষ্টা করছে।
কালকিনিতে ঈগল সমর্থককে কুপিয়ে হত্যা
ঈগল সমর্থককে হত্যায় কঠোর হবে ইসি
নৌকা ও কাঁচি সমর্থকদের পাল্টাপাল্টি হামলার অভিযোগ