নওগাঁয় এক ইউনিয়ন ভূমি সহকারীর বিরুদ্ধে খাজনা-খারিজে ঘুষ, সরকারি জমি ব্যক্তির নামে নামজারিসহ অবৈধভাবে নামে-বেনামে কোটি টাকার সম্পদ গড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আরও অভিযোগ, এর সবই তিনি করেছে সাবেক ক্ষমতাসীনদের ছাত্রছায়ায়। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে জেলা প্রশাসন।
অভিযুক্তের নাম মৌদুদুর রহমান কল্লোল। তিনি নওগাঁ সদর-চন্ডিপুর ইউনিয়নের সাবেক সহকারী ভূমি কর্মকর্তা। বর্তমানে তাকে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার রাইগাঁ-এনায়েতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হয়েছে।
সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে নওগাঁ সদর উপজেলার মধ্য-দুর্গাপুর গ্রামে ঈদগাহের ২৪ শতাংশ জমি খারিজ করতে ৫৫ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে আলোচনায় আসেন কল্লোল। এরপর সামনে আসতে থাকে তার একের পর এক ঘুষ বাণিজ্যের তথ্য।
অভিযোগ আছে, নওগাঁর সাবেক এক জেলা প্রশাসকের প্রশ্রয়ে আর তৎকালীন সময়ে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতায় ব্যাপক প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন কল্লোল। এমনকি বিভাগীয় কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বললে নানাভাবে হয়রানি করতেন তিনি, রয়েছে এমন অভিযোগও।
গত ১৮ আগস্ট নওগাঁর সদ্য বদলি হওয়া জেলা প্রশাসক গোলাম মওলার হাতে বিভিন্ন দাবি নিয়ে স্মারকলিপি দিয়েছেন বৈষম্য বিরোধী শিক্ষার্থীরা। এতে অন্য বিষয়ের সঙ্গে কল্লোলের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ বিচারসহ অপসারণ চাওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের সূত্র বলছে, এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে ১৯ আগস্ট নওগাঁ থেকে সরিয়ে জেলার মহাদেবপুর উপজেলার রাইগাঁ-এনায়েতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতা মিজানুর রহমান বলেন, নওগাঁ জেলায় সবগুলো ভূমি অফিস দুর্নীতির আখড়া। ঘুষ ছাড়া কেউ কোনো সেবা দেন না। এসব সিন্ডিকেটের মাথা কল্লোল। তার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ থাকায় তদন্তসহ অপসারণ চাওয়া হয়েছে।
নওগাঁর সদর উপজেলার ফতেপুর বাজারের চা বিক্রেতা আলম হোসেন বলেন, চার শতক জমি খারিজ করতে করতে কল্লোল তার কাছে থেকে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে মাত্র ৩০০ টাকার চেক দেন।
ফতেপুর বাজারের সবজি বিক্রেতা ফজলুর রহমান জানান, তার সাড়ে তিন কাঠা জমি খারিজ করতে গেলে কল্লোল তার কাছ থেকে সাত হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। তার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে একাধিক অভিযোগ দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এমন অভিযোগ ইকরতারা গ্রামের বাসিন্দা রাজু সরদার, নওগাঁ পৌরসভার সাত নম্বর ওয়ার্ডের আলম মণ্ডলসহ অনেকের।
অনুসন্ধানে শহরের দুর্গাপুর গ্রামের দুর্গাপুর মৌজায় এনিমি প্রোপার্টিসহ ১০-১২ বিঘা জমির সন্ধান পাওয়া গেছে। যে জমিগুলো কল্লোলের বেয়াই সাবেক পৌর কাউন্সিলর নাজমুল হক মন্টু দেখভাল করছেন। এছাড়া শহরের বিভিন্ন স্থানে নামে ও বেনামে আরও কোটি কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে জানা গেছে।
নওগাঁর জ্যৈষ্ঠ সাংবাদিক ও জেলা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি কায়েস উদ্দিন জানান, শহরের বাঙ্গাবাড়িয়া এলাকায় একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সরকারি জায়গা অবৈধভাবে দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেন। এই বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা কল্লোলকে জানালে তারা সার্ভে করে জানতে পারেন যে জায়গাটি সরকারি। পরে কল্লোলকে ম্যানেজ করে সরকারি জায়গাটি ওই দখলকারী ব্যক্তি অন্য মানুষের কাছে বিক্রি করেন। এই বিষয়ে প্রতিবাদ করায় তারা আমার বাড়িতে এসে বিভিন্ন ধরণের হুমকিও দিয়েছেন।
তবে মৌদুদুর রহমান কল্লোল তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, গত ১০ বছর থেকে নিয়মিত আয়কর দিয়ে আসছেন। শেষে বৈরীতা সৃষ্টি না করে একটি সমাধানে আসার প্রস্তাবও দেন সাংবাদিকদের।
নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. সোহেল রানা জানান, কল্লোলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মরত একজন সিনিয়র সহকারী কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। আশা করি তিনি সততার সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেবেন। তদন্তে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাইকারি ও খুচরায় ডিম-মুরগির দাম বেঁধে দিলো সরকার