হাওরের বিস্তীর্ণ জনপদে আকাশ ভেঙে নামছে মরণ। বছরের পর বছর বজ্রপাতে বাড়ছে লাশের মিছিল। অথচ এই মৃত্যু ঠেকাতে নেওয়া সরকারি উদ্যোগগুলো এখন কেবলই কাগজের দলিল। বজ্রপাত প্রতিরোধে রোপণ করা এক লাখ তালগাছের হদিস নেই, আর কোটি টাকা ব্যয়ে বসানো বজ্রনিরোধক দণ্ডও হাওরবাসীর কোনো কাজে আসছে না। গত পাঁচ বছরে এই জেলায় বজ্রাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৭২ জন, যাদের অধিকাংশই প্রান্তিক কৃষক ও জেলে।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ পুনর্বাসন শাখা এবং স্থানীয় সূত্রে সুনামগঞ্জের বজ্রপাত পরিস্থিতির এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বজ্রপাত থেকে বাঁচতে ২০১৮ সালে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে এক লাখ এবং ২০২৪ সালে আরও দুই হাজার তালগাছ রোপণ করা হয়েছিলো। কিন্তু সঠিক পরিচর্যার অভাবে রোপণ করা সেসব চারা অঙ্কুরেই মরে গেছে। বর্তমানে হাওরজুড়ে এসব তালগাছের কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই।
অন্যদিকে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এক কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে জেলার ছয়টি উপজেলায় ১৮টি বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় এই দণ্ডগুলো যেমন নগণ্য, তেমনি এগুলোর কার্যকর কোনো সুফলও পাচ্ছে না হাওরবাসী। ফলে জীবনঝুঁকি নিয়েই বোরো মৌসুমে হাওরে কাজ করতে হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষদের।
সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে প্রতি বছরই বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে। গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- ২০২২ সালে মৃত্যু হয়েছে ছয় জনের, ২০২৩ সালে রেকর্ড ২৯ জন প্রাণ হারান, ২০২৪ সালে নিহত হন ১১ জন, ২০২৫ সালে প্রাণ গেছে ১৫ জনের এবং ২০২৬ সালে ২৯ এপ্রিল পর্যন্তই মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের।
সুনামগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ পুনর্বাসন শাখার তথ্যমতে মৃতের সংখ্যা ৭০ হলেও বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা ৭২ ছাড়িয়েছে।
রোপণ করা তালগাছগুলো কেন হারিয়ে গেরো, তা জানতে চেয়ে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মিনহাজুর রহমান। তিনি বলেন, তালগাছগুলো রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে তদন্তের পাশাপাশি হাওর এলাকার কৃষকদের মধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
তবে স্থানীয়রা মনে করছেন, তালগাছ একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বর্তমানে যে হারে মৃত্যু বাড়ছে, তা ঠেকাতে আধুনিক গবেষণাধর্মী ও তাৎক্ষণিক কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
