নারীর প্রকৃত অস্তিত্বের প্রতি সম্মান এবং নিজ ব্যক্তিত্ব ও সৌন্দর্যবোধ নিয়েই একজন নারী। রবীন্দ্রনাথ নারীকে যেভাবে দেখিয়েছেন তার চিত্রাঙ্গদা নাটকে।
রবীন্দ্রনাথ একের পর এক সৃষ্টিতে নারী তথা বৃহৎ বিশ্বমানবেরই জয়গান গেয়ে গেছেন। ‘শ্যামা’, ‘চিত্রাঙ্গদা’ ও ‘চণ্ডালিকা’ শীর্ষক তিনটি নৃত্যনাট্যে তিনি সাধন করেছেন নারীমুক্তির নতুন বিপ্লব। নাটক ও অন্যান্য রচনায় প্রতিষ্ঠা করেছেন নারীর মূল্য। সন্ধান করেছেন প্রেম ও কর্মশক্তির সমন্বয়ে নারীর ভেতর এক কল্যাণী রূপের। আর রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যে আমরা খুঁজে পাই প্রকৃতির সমান্তরালে নারী মুক্তির নব আবাহন।
তাই তো রবীন্দ্রনাথের লেখায়-
আমি চিত্রাঙ্গদা, আমি রাজেন্দ্রনন্দিনী।
নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী।
পূজা করি মোরে রাখিবে ঊর্ধ্বে, সে নহি নহি,
হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে, সে নহি নহি।
সময়কাল ১৯৩৬। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করলেন ‘চিত্রাঙ্গদা’। মূল রচনাটি ছিল নাট্যকাব্য। কিন্তু পরে এই কাব্যনাট্য রূপ নেয় নৃত্যনাট্যে। আর উপাখ্যানের উৎস মহাভারত। যে গল্প রয়েছে মহাভারতের আদি পর্বের ‘অর্জুন বনবাস পর্বাধ্যায়’-এ। যদিও রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদায় সে কাহিনী অনেকটায় গৌণ। তিনি তার কাব্যনাট্যে প্রধান উপজীব্য করলেন নায়িকার হৃদয়দ্বন্দ্বকেই। ম্লান করে রাখলেন স্বয়ং অর্জুনকেও।

মহাভারতের চিত্রাঙ্গদা
চিত্রাঙ্গদা মহাভারত মহাকাব্যের একটি চরিত্র। তিনি রাজা চিত্রবাহনের কন্যা ও অর্জুনের তৃতীয়া স্ত্রী।
মণিপুরের রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা। মণিপুর রাজের ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে শিব বর দিয়েছিলেন যে তার বংশে কেবল পুত্রই জন্মাবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও যখন রাজকূলে চিত্রাঙ্গদার জন্ম হল রাজা তাকে পুত্ররূপেই পালন করলেন।
রাজকন্যার অভ্যাস করতে হলো ধনুর্বিদ্যা, শিক্ষা করতে হলো যুদ্ধবিদ্যা ও রাজদণ্ডনীতি।
মণিপুররাজ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তার কন্যার সাথে কেবলমাত্র মহাবীর অর্জুনের বিবাহ দেবেন। ওইদিকে ইন্দ্রপ্রস্থে সহবাসরত যুধিষ্ঠির ও পাঞ্চালিকে দেখে ফেলে অর্জুনের দ্বাদশ বর্ষ বনবাস হয়। অর্জুন দ্বাদশবর্ষব্যাপী ব্রহ্মচর্য ব্রত পালনের সময় ভ্রমণ করতে করতে এলেন মণিপুররাজ্যে। সেই সময়ে অর্জুন চিত্রাঙ্গদার প্রেমে পড়েন।
নাটকে চিত্রাঙ্গদা
নারীর আত্মঅধিকার প্রেরণার স্মারক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিত্রাঙ্গদা’। কাহিনীর আঙ্গিক এবং বিষয়বস্তু গুণে ‘চিত্রঙ্গদা’ বিশ্ব সাহিত্যে দুর্লভ সম্পদ। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯২ সালে মাত্র একত্রিশ বছর বয়সে মহাভারতের চিত্রাঙ্গদা উপাখ্যান রূপক ধরে আধুনিক সময়ে মানবের অন্তর্দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছায়া রূপ হিসেবে কাব্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’ রচনা করেন। এর প্রায় চুয়াল্লিশ বছর পর ১৯৩৬ সালে তার পঁচাত্তর বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন নৃত্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’, যেটি দেশ-বিদেশে অসংখ্য নাট্যদলের মঞ্চায়নের মাধ্যমে সুপরিচিত। অন্যদিকে কাব্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’ একটি দুরূহ ও অপ্রচলিত রচনা হিসেবে স্বীকৃত ছিল, এমনকি রবীন্দ্রনাথও কখনই এটি মঞ্চায়নে উদ্যোগী হননি। তবে সম্প্রতি ‘চিত্রাঙ্গদা’ নাটকটি নিয়মিতভাবে মঞ্চায়ন করে আসছে বিভিন্ন নাট্য সংগঠন ।
চিত্রঙ্গদায় নারী অধিকারের বিষয়টি নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই নাটকের কাহিনীতে দেখা যায় মহাবীর অর্জুন সত্যপালনের জন্য একযুগ ব্রহ্মচার্যব্রত গ্রহণ করে মণিপুর বনে অসেন। মণিপুরের রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা অর্জুনের প্রেমে উদ্বেলিত হলেও অর্জুন রূপহীন চিত্রাঙ্গদাকে প্রত্যাখ্যান করেন। অপমানিত চিত্রাঙ্গদা প্রেমের দেবতা মদন ও যৌবনের দেবতা বসন্তের সহায়তায় এক বছরের জন্য অপরূপ সুন্দরীতে রূপান্তরিত হন। অর্জুন চিত্রাঙ্গদার প্রেমে পড়েন। কিন্তু অর্জুনকে লাভ করেও চিত্রাঙ্গদার অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকে অর্জুন প্রকৃতপক্ষে কাকে ভালোবাসেন, চিত্রাঙ্গদার বাহ্যিক রূপ নাকি তার প্রকৃত অস্তিত্বকে? অতঃপর চিত্রাঙ্গদার আত্মদ্বন্দ্ব আর নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে এ সত্য উপলব্ধি করা যায় যে, বাইরের অবয়বের চেয়ে নারী-পুরুষের চারিত্রশক্তি বেশি মূল্যবান এবং এতেই প্রকৃতপক্ষে আত্মার স্থায়ী পরিচয়। পাশাপাশি এতে নারী-পুরুষের সম্মানজনক সহাবস্থান এবং এক্ষেত্রে পুরুষের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে চিত্রাঙ্গদায়।
বাইরের রূপ নয়, নারীর আপন অন্তরের মাঝে লুকিয়ে থাকা ব্যক্তিত্ব আর সৌন্দর্যবোধই প্রকৃত সত্য ও সুন্দর।
