ফরাসি চলচ্চিত্রের অবিসংবাদিত গ্ল্যামার রানি ও প্রয়াত স্ক্রিন লিজেন্ড ব্রিজিত বার্দোর রেখে যাওয়া বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি এখন তুঙ্গে। এর মাঝেই সামনে এসেছে বার্দোর নিজের হাতে লেখা একটি অতি গোপন চিঠি, যা তাঁর শেষ জীবনের সঙ্গী বার্নার্ড ডি চিয়ারার সম্পর্কের ওপর চরম এক চাবুক মেরেছে। মৃত্যুর তিন বছর আগে লেখা ওই চিঠিতে বার্দো অভিযোগ করেছেন, তাঁর সঙ্গে তিন দশকেরও বেশি সময় কাটানো সঙ্গী ডি চিয়ারা আসলে ‘দিনের পর দিন তিলে তিলে তাকে ধ্বংস করেছেন’।
বার্দোর মৃত্যুর পর তৈরি হওয়া সম্পত্তি দখলের লড়াইয়ে এই ফাঁস হওয়া চিঠিটি তাঁর নামে গড়ে ওঠা পশু কল্যাণ ফাউন্ডেশনের হাতে এক মোক্ষম হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৮৫ বছর বয়সী ডি চিয়ারা উল্টো অভিযোগ করেছিলেন, অভিনেত্রী মারা যেতে না যেতেই তাঁর কাছের মানুষদের কোনো তোয়াক্কা না করে সব সম্পত্তি তড়িঘড়ি নিজেদের কবজায় নেওয়ার চেষ্টা করছে ফাউন্ডেশন।

গত সপ্তাহেই ফ্রান্সের সাঁ-ত্রোপে সমুদ্রতীরের আইকনিক বাড়ি ‘লা মাদ্রেগ’ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বৃদ্ধ ডি চিয়ারা। নব্বইয়ের দশক থেকে এই বাড়িতেই বার্দোর সঙ্গে থাকতেন তিনি। সারাজীবন বার্দোর অর্থেই সংসার চললেও, এই বয়সে এসে ডি চিয়ারার নিজস্ব কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বা সামাজিক নিরাপত্তা কার্ডও নেই!
অন্যদিকে সেপ্টেম্বর মাসে বার্দোর প্যারিসের ফ্ল্যাট থেকে নানা স্মৃতিচিহ্ন বিক্রি করে প্রায় ১০ লাখ ইউরো তোলে ফাউন্ডেশন ও বার্দোর একমাত্র ছেলে নিকোলাস চারিয়ার। এই নিয়ে ডি চিয়ারার ক্ষোভ, মৃত্যুর কয়েক মাস যেতে না যেতেই তাকে স্যুভেনির বানিয়ে ব্যবসা শুরু করাটা মেনে নেওয়া যায় না।

চিঠিতে বার্দো অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে লিখেছিলেন, বার্নার্ড, আমাদের সম্পর্কটা একটা ব্যর্থতা! ভালোবাসা পাওয়ার আশায়, নিজের আনন্দ-বেদনা ভাগ করে নেওয়ার জন্য তোমায় সর্বস্ব দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমি নিরাশ। আমার এমন একজন সঙ্গীর দরকার ছিল যার একটু আশ্রয়, ভালোবাসা আর উপস্থিতি পাব—যা দেওয়ার ক্ষমতা তোমার কোনোদিনই ছিল না।
ড'অরমেল নামে পরিচিত এই ডি চিয়ারা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং কট্টর ডানপন্থী নেতা জঁ-মারি ল্য পেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তাঁদের সম্পর্ক সবসময়ই বেশ চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। ফরাসি আইনে তাদের আনুষ্ঠানিক বিয়ে না হলেও শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বার্দোর সঙ্গেই ছিলেন।

তবে গত ডিসেম্বরে বার্দোর মৃত্যুর পর যে উইল পাঠ করা হয়, তাতে ডি চিয়ারাকে এক ছটাক সম্পত্তিও দেয়া হয়নি! উইলে সব সম্পত্তি ভাগ করে দেয়া হয় তাঁর ফাউন্ডেশন ও নরওয়েতে থাকা ছেলেকে। এমনকি বার্দো নিজে নির্দেশ দিয়ে গেছেন যে তাঁর মৃত্যুর ৬ মাসের মধ্যে ডি চিয়ারাকে লা মাদ্রেগের বাড়ি ছাড়তে হবে।
আইনজীবীরা যখন বার্দোর বাকি সম্পদের হিসাব কষছেন, তখন ফাউন্ডেশন ডি চিয়ারার বিরুদ্ধে কটেজ থেকে মিনি মক জিপসহ একাধিক বহুমূল্য সামগ্রী সরিয়ে ফেলার অভিযোগ এনেছে। ফাউন্ডেশনের দাবি, আইন ও বার্দোর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ীই কাজ করা হচ্ছে। বর্তমানে সাঁ-ত্রোপে সিটি করপোরেশনের ভাড়া করা এক ছোট ফ্ল্যাটে দিন কাটছে গৃহহীন ডি চিয়ারার।

বার্দোর দুই বিশাল প্রাসাদোপম বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের চড়া খরচ তুলতে বাড়ি দুটি ঘুরে দেখার জন্য পর্যটকদের উন্মুক্ত করা কিংবা শুটিং ও ফ্যাশন শো’র জন্য ভাড়া দেয়ার পরিকল্পনা করছে ফাউন্ডেশন। ১৯৭৩ সালে রূপালী পর্দা ছেড়ে বাকি জীবন পশুপ্রেমী হিসেবে বিলিয়ে দেওয়া বার্দোর ফাউন্ডেশন এখন প্রায় ১৩ হাজার পশুর দেখভাল করছে।
রজার ভাদিম, জ্যাক চারিয়ার এবং গুন্থার স্যাক্সের মতো বিখ্যাত পুরুষদের সাথে তিনবার বিয়ের পিঁড়িতে বসা এই গ্ল্যামার গার্ল নরওয়েতে ডি চিয়ারার সঙ্গে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান করলেও ফরাসি আইনে তার কোনো আইনি ভিত্তি ছিল না। ফলে জীবনের অন্তিমে এসে একদিকে বিপুল অর্থের লড়াই, অন্যদিকে ফাঁস হওয়া এক চিঠির বোমায় বার্দোর মৃত্যুর পরও কেলেঙ্কারির উত্তাপ কমছে না ফরাসি মুলুকে!
তথ্যসূত্র: বিবিসি
