১৯৫০-এর দশকের চলচ্চিত্রে নারীদের গতানুগতিক চিত্রায়নকে ভেঙে চুরমার করে দেয়া ও যৌন স্বাধীনতার এক নতুন যুগের প্রতীক হয়ে উঠা ফরাসি কিংবদন্তী ব্রিজিত বার্দো ৯১ বছর বয়সে মারা গেছেন। সেই সঙ্গে পেছনে ফেলে গেছেন সফলতা ও ব্যর্থতার এক বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার।

পর্দায় তিনি ছিলেন চপল আকর্ষণ ও কামুকতার এক সংমিশ্রণ। একটি প্রকাশনী তাকে ‘অভিমানী রাজকুমারী’ বলে অভিহিত করেছিল, কিন্তু এই ইমেজটিকে তিনি কালক্রমে ঘৃণা করতে শুরু করেন। শুধুই যৌন প্রতীক হিসেবে নির্মমভাবে বাজারজাত করার ফলে একজন ভালো অভিনেত্রী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার অপূর্ণই থেকে যায়। শেষ পর্যন্ত তিনি অভিনয় জীবন ত্যাগ করে প্রাণিকল্যাণ আন্দোলনে নিজেকে উৎসর্গ করেন।

পরবর্তী বছরগুলোতে সমকামবিদ্বেষী মন্তব্য এবং বর্ণবিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে একাধিকবার জরিমানার মুখে পড়লে তার খ্যাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি তার ছেলে তার বিরুদ্ধে মানসিক ক্ষতির মামলা করেছিলেন, কারণ বার্দো বলেছিলেন, তিনি মানুষের বাচ্চার চেয়ে একটি ছোট কুকুরের জন্ম দেয়া পছন্দ করতেন। এটি ছিল এক কিংবদন্তির স্মৃতিতে একটি কলঙ্কিত দাগ, যিনি তার যৌবনে বিকিনি, নারীর কামনা ইচ্ছা এবং ফরাসি চলচ্চিত্রকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করেছিলেন।

প্রারম্ভিক জীবন
ব্রিজিত আন-মারি বার্দো ১৯৩৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্যারিসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এবং তার বোন মারি-জান শহরের অন্যতম অভিজাত এলাকায় একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে বেড়ে ওঠেন। তার ক্যাথলিক বাবা-মা ছিলেন অত্যন্ত ধনী ও ধর্মপ্রাণ এবং সন্তানদের ওপর তাদের ছিল কঠোর শাসন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন জার্মান সেনারা প্যারিস দখল করেছিল, বার্দো বেশিরভাগ সময় বাড়িতে রেকর্ড চালিয়ে নাচতেন। তার মা তাকে উৎসাহিত করেন এবং সাত বছর বয়সে ব্যালে ক্লাসে ভর্তি করিয়ে দেন। প্যারিস কনজারভেটরি’তে তার শিক্ষক তাকে একজন অসাধারণ ছাত্রী হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

'জ্যন ফি' হিসেবে জীবন
১৫ বছর বয়সে একটি পারিবারিক বন্ধুর প্ররোচনায় তিনি 'এলে' ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের জন্য পোজ দেন এবং সেই ছবিগুলো আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই সময়ে ফ্যাশনেবল নারীদের ছোট চুল এবং জ্যাকেটের প্রচলন ছিল, কিন্তু বার্দোর কাঁধের ওপর ছড়িয়ে থাকা দীর্ঘ চুল এবং ব্যালে নর্তকীর মতো নমনীয় শরীর তাকে সবার থেকে আলাদা করে তুলেছিল। ১৬ বছর বয়সে তিনি প্যারিসের সবচেয়ে বিখ্যাত কভার গার্ল হয়ে ওঠেন।

তার ছবিগুলো চলচ্চিত্র পরিচালক মার্ক অ্যালেগ্রের নজর কাড়ে, যিনি তার সহকারী রজার ভাদিমকে বার্দোকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। স্ক্রিন টেস্ট সফল না হলেও ভাদিম বার্দোর প্রেমে পড়েন। বার্দোর বাবা-মা এই সম্পর্কের কথা জানতে পেরে তাকে ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিলে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত ১৮ বছর বয়স হওয়ার পর তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

আইকন হয়ে ওঠা
ভাদিম বার্দোকে সেই তারকা হিসেবে গড়ে তুলতে শুরু করেন যা তিনি কল্পনা করেছিলেন। ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত বার্দো মূলত বিকিনি পরে পোজ দেয়া এবং 'বিহাইভ' হেয়ারস্টাইল জনপ্রিয় করার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। সেই বছর ভাদিমের প্রথম ছবি 'অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওম্যান' মুক্তি পায়। ছবিটি ফ্রান্সে খুব একটা ব্যবসা করতে না পারলেও যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার তাকে ‘চূড়ান্ত স্বাধীনতার’ আইকন হিসেবে প্রশংসা করেন। কিন্তু আমেরিকান রক্ষণশীলরা এর তীব্র বিরোধিতা করে। সংবাদপত্রে ছবিটির সমালোচনা করা হয়, কিন্তু দর্শকদের কাছে বার্দো রাতারাতি সুপারস্টার হয়ে ওঠেন।

একজন অনিচ্ছুক মা
১৯৫৯ সালে বেশ কিছু প্রেমের সম্পর্কের পর বার্দো অভিনেতা জ্যাক চ্যারিয়ারকে বিয়ে করেন। তাদের একটি ছেলে হয় যার নাম নিকোলাস। কিন্তু বার্দো তার গর্ভাবস্থাকে মেনে নিতে পারেননি। এমনকি গর্ভপাতের চেষ্টাও করেছিলেন। বিচ্ছেদের পর ছেলে নিকোলাস কয়েক দশক তার মায়ের সাথে দেখা করেননি। পরবর্তীতে বার্দো তার আত্মজীবনীতে লিখেন যে তিনি মানুষের চেয়ে ‘কুকুরছানা জন্ম দেওয়া’ ভালো মনে করতেন, যার প্রেক্ষিতে নিকোলাস তার মায়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

বার্দো এক সময় ফ্রান্সের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেত্রী ছিলেন। তিনি সিরিয়াস চরিত্রে অভিনয় করতে চাইলেও তাকে মূলত পর্দায় খোলামেলা উপস্থাপনের জন্যই ব্যবহার করা হতো। তা সত্ত্বেও জঁ-লুক গদারের 'লে মেপ্রি' এর মতো ড্রামা ছবিতে তিনি সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করেন।
প্রাণিকল্যাণ ও পরবর্তী জীবন
১৯৭৩ সালে প্রায় ৫০টি ছবিতে অভিনয়ের পর তিনি অবসরের ঘোষণা দেন। তিনি বলেছিলেন, আমি আমার সৌন্দর্য ও যৌবন পুরুষদের দিয়েছি; এখন আমি আমার প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা পশুদের দেব। তিনি তার গয়না এবং চলচ্চিত্রের স্মারক নিলামে তুলে 'ব্রিজিত বার্দো ফাউন্ডেশন' গঠন করেন। তিনি কানাডায় সিল মাছ নিধন এবং ফ্রান্সে ঘোড়ার মাংস খাওয়ার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালান।

একটি অশান্ত জীবনের সমাপ্তি
জীবনের শেষভাগে তিনি একাধিকবার বর্ণবিদ্বেষী আচরণের জন্য অভিযুক্ত হন। ১৯৯৯ সালে তিনি লেখেন, তার দেশ বিদেশি বিশেষ করে মুসলিমদের দ্বারা অধিকৃত হচ্ছে, যার জন্য তাকে বিশাল অংকের জরিমানা গুনতে হয়। তিনি আন্তঃবর্ণ বিবাহ এবং সমকামীদের নিয়েও আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন।
২০০৮ সাল নাগাদ প্রসিকিউটররা তাকে বারবার অভিযুক্ত করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তার চতুর্থ স্বামী বার্নার্ড ডি’রমাল ছিলেন উগ্র-ডানপন্থী রাজনীতিবিদ লে পেনের প্রাক্তন উপদেষ্টা। শেষ জীবনে বার্দো অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে বর্ণবিদ্বেষী মামলার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করতে করতেই সময় কাটিয়েছেন।
এভাবেই এক সময়ের ফরাসি স্বাধীনতার প্রতীক ‘মারিয়া’-এর মুখচ্ছবি এবং আধুনিক মুক্তমনা নারীর আইকন বার্দোর জীবনের সমাপ্তি ঘটে এক বিতর্কিত আবহে।
ফরাসি সিনেমার ‘আইকন’ ব্রিজিত বার্দো মারা গেছেন