ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোয় (ডিআর কঙ্গো) একটি বিরল ও প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক রূপ নেওয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এটিকে ‘আন্তর্জাতিক উদ্বেগের পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি’ বা আন্তর্জাতিক জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মধ্যে অন্তত ছয়জন মার্কিন নাগরিক ভাইরাসটির সংস্পর্শে এসেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই ভাইরাসটি গোপনে ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, কঙ্গোতে ৩৩৬ জন সম্ভাব্য আক্রান্ত এবং ৮৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে (যার মধ্যে প্রায় ২৫০টি সম্ভাব্য কেস এবং ৮০টি মৃত্যুর ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত)।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, অন্তত ছয়জন আমেরিকান এই ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের শরীরে ইবোলার লক্ষণ দেখা গেছে এবং অন্য তিনজনের ক্ষেত্রে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সংস্পর্শের প্রমাণ মিলেছে। মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) আক্রান্ত এলাকা থেকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত অল্প সংখ্যক আমেরিকানকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করেছে। আক্রান্তদের জার্মানির একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে নিয়ে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। এদিকে মার্কিন প্রশাসন কঙ্গোর জন্য ‘লেভেল ফোর’ বা সর্বোচ্চ স্তরের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো, এবারের প্রাদুর্ভাবটি ইবোলার অত্যন্ত বিরল ‘বুন্দিবুগিও’ প্রজাতির ভাইরাস দ্বারা ঘটছে। সাধারণত কঙ্গোতে দেখা যাওয়া ‘জাইরে’ স্ট্রেনের জন্য কার্যকর ভ্যাকসিন ও ওষুধ থাকলেও, এই বুন্দিবুগিও স্ট্রেনের জন্য অনুমোদিত কোনো প্রতিষেধক বা ওষুধ নেই। এর আগে ২০০৭ এবং ২০১২ সালে মাত্র দুবার এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল, যেখানে আক্রান্তদের মৃত্যুর হার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ট্রুডি ল্যাং জানান, বুন্দিবুগিও ভাইরাসের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর প্রাথমিক পরীক্ষাগুলো সহজে ধরা পড়ে না। কঙ্গোর নার্সের শরীরে প্রথম গত ২৪ এপ্রিল এর লক্ষণ দেখা দিলেও রোগটি শনাক্ত করতে ল্যাবরেটরিতে অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়, যার কারণে প্রাদুর্ভাবটি নিশ্চিত করতেই তিন সপ্তাহ দেরি হয়ে গেছে।
কোনো সুনির্দিষ্ট ওষুধ না থাকায় চিকিৎসকরা এখন রোগীদের তরল খাবার, পুষ্টি ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণের মতো প্রাথমিক সেবা বা 'অপ্টিমাইজড সাপোর্টিভ কেয়ার'-এর ওপর নির্ভর করছেন।

ইবোলার লক্ষণ কি এবং কতোটা প্রাণঘাতী
ইবোলা একটি বিরল কিন্তু অত্যন্ত মারাত্মক রোগ। এটি মূলত ফলখেকো বাদুড় ও অন্যান্য প্রাণীর মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। মানুষের শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটার ২ থেকে ২১ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়। শুরুতে হঠাৎ তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা ও ক্লান্তির মতো ফ্লুয়ের মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
রোগ বাড়ার সাথে সাথে বমি, ডায়রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তপাত শুরু হতে পারে, যা লিভার ও কিডনি বিকল করে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল পদার্থ, যেমন- রক্ত বা বমির সরাসরি সংস্পর্শে এলে অন্য মানুষ এতে সংক্রামিত হয়।
আফ্রিকা সিডিসির মহাপরিচালক জিন কাসেয়া সতর্ক করেছেন, ওষুধ না থাকায় মানুষকে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, বিশেষ করে মৃতদেহের দাফন বা সৎকারের সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এক দশক আগের পশ্চিম আফ্রিকার প্রাদুর্ভাবে মৃতদেহ ধোয়ার সামাজিক রেওয়াজ থেকে বহু মানুষ সংক্রামিত হয়েছিল।
বর্তমানে কঙ্গোর পাশাপাশি প্রতিবেশী উগান্ডাতেও দুজন আক্রান্ত হয়েছেন এবং একজন মারা গেছেন। কঙ্গোর এই অঞ্চলটি দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধকবলিত এবং এখানে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত।
তদুপরি, এলাকাটি খনিপ্রধান হওয়ায় এখানকার মানুষ অত্যন্ত গতিশীল এবং ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করে। ফলে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডা, রুয়ান্ডা, দক্ষিণ সুদান ও নাইজেরিয়ায় এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। ডব্লিউএইচও আক্রান্ত দেশগুলোকে সীমান্ত স্ক্রিনিং জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছে এবং রুয়ান্ডা ইতিমধ্যেই কঙ্গো সীমান্তে কড়াকড়ি শুরু করেছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন, এই জরুরি অবস্থা ঘোষণার মানে এই নয় যে বিশ্ব আরেকটি কোভিড-১৯-এর মতো মহামারির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের জন্য এর ঝুঁকি অত্যন্ত নগণ্য।
২০১৪-২০১৬ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল, যেখানে ২৮,৬০০ মানুষ আক্রান্ত এবং ১১,৩২৫ জন মারা যান; তখনও কিন্তু যুক্তরাজ্য বা আমেরিকার মতো দেশে এর প্রভাব ছিল সামান্য এবং তা শুধু স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
তাছাড়া, কঙ্গোর ইবোলা মোকাবিলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাই এক দশক আগের তুলনায় তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখন অনেক শক্তিশালী। বর্তমান আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে এই প্রাদুর্ভাব দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে নাকি আবারও পুরোনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
