গত ২৪ ফেব্রুয়ারি স্থল, নৌ ও আকাশপথে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। একে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনো ইউরোপীয় দেশ কর্তৃক অন্য ইউরোপীয় দেশের ওপর সবচেয়ে বড় সামরিক আক্রমণ বলা হচ্ছে।
প্রথমদিকে পশ্চিমা বিশ্ব ধারণা করছিলো, দ্রুতই কিয়েভ দখল করে ইউক্রেন সরকারের পতন ঘটিয়ে ফেলবে রাশিয়া। তবে আক্রমণের ১৬ দিনে এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র একটি শহরের দখল নিতে পেরেছে তারা।
যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে রাশিয়া ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করে কৌশলগত আক্রমণ করলেও, পরবর্তীতে তারা স্থলপথে আক্রমণ ও বড় বড় শহরগুলো দখলের দিকে মনোযোগ দেয়।
বেসামরিক নাগরিকদের ওপর আক্রমণের অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে রাশিয়া দাবি করে, প্রতিবেশিকে নিরস্ত্র করে তারা ইউক্রেনের 'জাতীয়তাবাদী' নেতাদের অপসারণ করতে চায়।
অন্যদিকে ইউক্রেন ও এর পশ্চিমা মিত্রদের অভিযোগ, কোনোরকম উসকানি ছাড়াই ইউক্রেন আক্রমণ করে নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করছে রাশিয়া।
মিসাইল আক্রমণ
আক্রমণের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় ক্রুজ মিসাইল এবং স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, হামলার প্রথম পর্যায়ে স্থল ও নৌপথে একশ'রও বেশি মিসাইল ছোঁড়ে রাশিয়া।
ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) গবেষণা বিশ্লেষক টিমোথি রাইট ধারণা করছেন, এসময় নিজেদের একমাত্র সক্রিয় স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল ইস্কান্দার-এম ব্যবহার করে তারা ।

ইউক্রেনের কাছে আরও বেশ পুরনো কিছু ব্যালিস্টিক মিসাইলের সরবরাহ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ওটিআর-২১ টচকা। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম কয়েকদিনে এর অন্তত একটি রাশিয়ার ভেতরে একটি বিমান ঘাঁটিতে আক্রমণ করতে ব্যবহার করা হয়েছিলো।
আইআইএসএস-এর তথ্য অনুযায়ী, টচকার চেয়ে ইস্কান্দারের পরিসীমা বেশি এবং এটি একসাথে একটির বেশি মিসাইল বহন করতে পারে। প্রতিটি ইস্কান্দার লঞ্চারে মিসাইল রাখার জন্য একটি সশস্ত্র ঢাকনা রয়েছে এবং এই কেবিনটি রাসায়নিক, জৈব, বিকিরণ ও পারমাণবিক আঘাত এবং উচ্চ তাপমাত্রা মোকাবেলা করতে সক্ষম।
সামরিক যানটি ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার বেগে এগারশ' কিলোমিটার পাড়ি দিতে পারে। এর সার্কুলার এরর প্রব্যাবল পাঁচ থেকে সাত মিটার, অর্থাৎ এর ছোঁড়া অর্ধেক মিসাইল লক্ষ্যস্থানের পাঁচ থেকে সাত মিটারের ব্যাসার্ধের বৃত্তের মধ্যে পড়বে। অন্যদিকে টচকার সার্কুলার এরর প্রব্যাবল ৯০ মিটার।
২৫ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের সামরিক কমান্ড দাবি করে, সুমি, পোলতাভা এবং মারিওপোল শহরে কৃষ্ণসাগর থেকে ৩এম১৪ ক্যালিবার ক্রুজ মিসাইল হামলা চালিয়েছে রাশিয়া।
ক্যালিবার একটি ল্যান্ড অ্যাটাক ক্রুজ মিসাইল, যার পরিসীমা প্রায় দেড় হাজার থেকে আড়াই হাজার কিলোমিটার। এর সার্কুলার এরর প্রব্যাবল অজানা হলেও, তা পাঁচ মিটারেরও কম বলে ধারণা করা হয়।

ইউক্রেনের বিমান ঘাঁটিতে রাশিয়ার আক্রমণ তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা সক্রিয় বিমানে আঘাত করতে ব্যর্থ হয় বলে জানিয়েছেন আইআইএসএস-এর প্রতিরক্ষা বিষয়ক গবেষক জোসেফ ডেম্পসি।
ইউক্রেনের কাছে কোল্ড ওয়ারের সময়কার রাশিয়া নির্মিত এস-৩০০ভি অ্যান্টি এয়ারক্র্যাফট মিসাইল সিস্টেম রয়েছে, যার অ্যান্টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ক্ষমতাও রয়েছে। তবে এসবের কোনোটি রাশিয়ান মিসাইলের বিরুদ্ধে তারা ব্যবহার করতে সমর্থ হয়েছে কিনা তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে কিছু এস-৩০০ভি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আক্রমণের প্রথম কয়েকদিনে ইউক্রেনের সরকারকে হটাতে ব্যর্থ হওয়ায় রাশিয়ার মিসাইল অভিযানের ফলাফল মিশ্র ছিল বলেই বলা যায়। তবে রাশিয়ার তুলনায় ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর সক্ষমতা নগণ্য হলেও, তারা কীভাবে এখনও নিজেদের আকাশসীমাকে রক্ষা করে চলেছে তা নিয়ে সামরিক বিশ্লেষকরা বিস্মিত।
স্থলযুদ্ধ
উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া এখন পর্যন্ত তেমন কিছুই করে দেখাতে পারেনি। তাদের ভারী বোমাবর্ষণের বিরুদ্ধে এখনও নিজেদের দখল ধরে রেখেছে কিয়েভ ও খারকিভ।
দেশব্যাপী গঠিত বেসামরিক প্রতিরক্ষা ইউনিট ও স্বাধীন মিলিশিয়ার সহায়তায় রাশিয়াকে বেশিদূর অগ্রসর হওয়া থেকে ঠেকিয়ে রেখেছে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী। আর তাদের সাহায্য করছেন এই দুই শহরের বাসিন্দারা।
আরবান গেরিলা
যুদ্ধে অপ্রচলিত কৌশলের ব্যবহার রাশিয়ান সেনাবাহিনীর জন্য অন্যতম সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে লুকানোর জন্য ভবন ও গাছপালা ব্যবহার করছে ইউক্রেনের সৈন্যরা।
গেরিলা যুদ্ধের অংশ হিসেবে শহরের বাসিন্দাদের বলা হয়েছে সড়ক থেকে সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলতে, যাতে রাশিয়ান সৈন্যরা তাদের গন্তব্য খুঁজে না পান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে মলোটভ ককটেল ব্যবহারের নির্দেশনা ছড়িয়ে দিচ্ছে ইউক্রেনের সরকার।

এছাড়াও সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত ব্যারিকেড, ট্যাংক এবং যুদ্ধযান ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইউক্রেনকে বেশ কিছু ভারী অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশ। এর মধ্যে রয়েছে সশস্ত্র সামরিক যান ধ্বংসকারী অস্ত্র, যার মধ্যে অন্যতম হলো 'এনল'।

পরবর্তী প্রজন্মের এই অ্যান্টি ট্যাংক মিসাইল সিস্টেমটি যৌথভাবে বানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সুইডেন। এছাড়াও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র নির্মিত এফজিএম-১৪৮ জ্যাভেলিন, যেটি কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে ট্যাংক ধ্বংস করতে পারে।

যুদ্ধে ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বেরাক্তার টিবি২ নামে একটি ড্রোন। তুরস্কের নির্মিত এই ড্রোনটি ছোট আকারের অস্ত্র বহন করতে পারে। তুরস্কে নিযুক্ত ইউক্রেনিয় রাষ্ট্রদূত ভাসিল বদনার জানান, রাশিয়ান সামরিক যান ধ্বংস করতে বেশ কার্যকরী হয়েছে এ ড্রোনগুলো।

একটি টিবি২ ড্রোন যানবাহন বিধ্বংসী ছোট অস্ত্র বহন করতে পারে। লেজার রশ্মি ব্যবহার করে এ ড্রোন ২২ কেজি ওজনের বোমা ফেলে যান ধ্বংস করতে পারে। তুরস্ক কিয়েভের কাছে এ ড্রোনের বেশ কিছু ব্যাচ বিক্রি করেছে বলে জানা গেছে।
অবরোধ কৌশল
যুদ্ধের সর্বশেষ কয়েকদিনে রাশিয়া তার কৌশল কিছুটা বদল করেছে। সরাসরি আক্রমণের পরিবর্তে তারা এখন অবরোধের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
গত সপ্তাহেই কিয়েভের বাসিন্দাদের পালিয়ে যেতে বলার পর শহরের ওপর বোমাবর্ষণ করে তারা।
খারকিভ এবং মারিওপোল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর গোলাবর্ষণ করে পানি, বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে রাশিয়া।
গোলাবর্ষণের ব্যবহৃত অন্যতম রাশিয়ান অস্ত্র হলো বিএম-২১। এটি একটি মাল্টিপল রকেট সিস্টেম, যার একটি ব্যাটালিয়ন একসাথে ৭২০টি রকেট ছুঁড়তে পারে।
এগুলো আক্রমণে খুব একটা সুনির্দিষ্ট না হওয়ায় লক্ষ্যবস্তুকে ধ্বংস করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো একটি এলাকায় একসাথে অনেকগুলো রকেট ছোঁড়া।
এ আক্রমণের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত কৌশল হলো শত্রুকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা। এরপর সরবরাহ ও পালানোর রাস্তা বন্ধ করে অস্ত্র, সৈন্য ও প্রকৌশলীদের নিয়ে একসাথে হামলা চালানো হয়।
ইউক্রেনে রাশিয়ান সেনাবাহিনী থার্মোবারিক অস্ত্রও ব্যবহার করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ অস্ত্র ব্যবহার করে প্রথমে একটি জ্বালানি মিশ্রণের 'মেঘ' তৈরি করা হয়। এরপর এতে অগ্নিসংযোগ করা হয়, যার ফলে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে।
রাশিয়া কর্তৃক থার্মোবারিক অস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস।

এছাড়াও রাশিয়ার ব্যবহৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে টিওএস-১ বুরাটিনো এবং ক্লাস্টার মিউনিশন।
একাত্তর/এসজে
