ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন না বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।
তবে পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রাশিয়ান সেনারা পিছু হটতে থাকায় পরাজয় এড়াতে রাশিয়া কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে এমন সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।
স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কী এই কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র, আর কেনই বা এগুলো এতো মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করছে?
'কৌশলগত' পারমাণবিক অস্ত্রের সংজ্ঞা
সর্বজনীন কোনো সংজ্ঞা না থাকলেও, কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের শ্রেণিবিন্যাস করা হয় তাদের আকৃতি, পাল্লা ও সীমিত সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে তাদের ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে।
সাধারণত গতানুগতিক বোমার চেয়ে আকারে অনেক বড় হয় কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র। বিস্ফোরণের পাশাপাশি তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ও অনান্য মারাত্মক প্রভাব রয়েছে এদের। তবে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই।
এগুলো 'নন-স্ট্র্যাটেজিক ওয়েপন' নামেও পরিচিত। যে অস্ত্র 'শত্রুর যুদ্ধ করার সক্ষমতা ও ইচ্ছাকে' আঘাত করতে তৈরি করা হয় তাকে স্ট্র্যাটেজিক ওয়েপন বলে সংজ্ঞায়িত করে মার্কিন সেনাবাহিনী। এসবের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে উৎপাদন, অবকাঠামো, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা।
অন্যদিকে, কৌশলগত বা ট্যাকটিকাল অস্ত্র তৈরি করা হয় আরও সীমিত ও তাৎক্ষণিক লক্ষ্য অর্জনে, যা যুদ্ধ জয়ে সহায়তা করবে। যেসব অস্ত্র বিস্ফোরণ তৈরির সময় কম শক্তি নির্গমন করবে সেগুলোকে ট্যাকটিকাল অস্ত্র বলা হয়।
এগুলোকে ব্যবহার করা যায় মিসাইল, আকাশ থেকে ফেলা বোমা বা কম পাল্লার আর্টিলারি শেলের সাথে যুক্ত করে।
আলজাজিরার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অ্যালেক্স গেতোপুলস বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক কমান্ডারদের বেশি পরিমাণে 'ফ্লেক্সিবিলিটি' দিতে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র আবিষ্কার করা হয়েছিলো। পঞ্চাশের দশকে যখন শক্তিশালী থার্মোনিউক্লিয়ার বোমা নির্মাণ ও পরীক্ষা করা হচ্ছিলো তখন সামরিক পরিকল্পনাবিদরা মনে করলেন, স্বল্প পাল্লার ছোট আকারের অস্ত্র যুদ্ধের 'কৌশলগত' পরিস্থিতিতে কাজে আসতে পারে।
আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের পরিবর্তনশীল 'ডায়াল-আপ' রয়েছে, যার মানে এর বিস্ফোরক ক্ষমতাকে অপারেটর ইচ্ছামত নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। একটি কৌশলগত অস্ত্রের শক্তি এক কিলোটনের ভগ্নাংশ থেকে ৫০ কিলোটনের মধ্যে হতে পারে। হিরোশিমায় ফেলা পারমাণবিক বোমার শক্তি ছিল ১৫ কিলোটন। এক কিলোটনের শক্তি হলো এক হাজার টন টিএনটির সমান।
যাদের কাছে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে
পৃথিবীর বেশ কয়েকটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের কাছে কম বিস্ফোরণ ক্ষমতার অস্ত্র রয়েছে যা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে।
মার্কিন কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের মার্চের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার কাছে নন-স্ট্র্যাটেজিক পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের জন্য এক হাজার থেকে দুই হাজার ওয়ারহেড রয়েছে।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পারমাণবিক শক্তিধর দেশ রাশিয়ার ওপর যেকোনো হামলা হলে পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে তার জবাব দেয়া হবে বলে বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
তার মতে, ১৯৪৫ সালে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমা ফেলে 'উদাহরণ' সৃষ্টি করেছিলো যুক্তরাষ্ট্র।

২০২২ সালের শুরুতে ৯টি দেশের কাছে প্রায় ১২ হাজার ৭০০টি ওয়ারহেড ছিল। পৃথিবীর ৯০ শতাংশ পারমাণবিক অস্ত্রই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার দখলে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় ২৩০টি নন-স্ট্র্যাটেজিক পারমাণবিক বোমা রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ইউরোপে মোতায়েন করা ১০০টি বি৬১ বোমা।
গত সপ্তাহে টানা বেশ কয়েকটি মিসাইল পরীক্ষা চালায় উত্তর কোরিয়া। দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র বর্ষণ করলে কী হবে দেখতেই এই পরীক্ষা চালানো হয়।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়ে যেতে থাকলে এর অংশ হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের ওয়ারহেড নির্মাণও করা হতে পারে।
ইউক্রেনে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা
পুতিনের পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তবে, ছোট আকারের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করলেও তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে এর আগে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
গত সপ্তাহে তিনি বলেন, 'আমার মনে হয় না বিপর্যয় সৃষ্টি না করে সহজভাবে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কোনো উপায় আছে'।
ইউক্রেনে যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া হোঁচট খাওয়ার পর পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের অচিন্তনীয় সম্ভাবনা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
১৯৯১ সালে স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কৌশলগত চিন্তার অংশ হিসেবে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের আবির্ভাব ঘটেনি।
আরও পড়ুন: ভারতে মানুষ বলিদানের অভিযোগে গ্রেপ্তার তিন
অ্যালেক্স গেতোপুলস বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে তার উৎস হচ্ছে স্নায়ুযুদ্ধ ও সেই সময়কার 'ব্যালেন্স অব টেরর', যা পৃথিবীকে নিরাপদ অথচ সর্বদা ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুতিন যদি এই যুদ্ধে জয়ের কাছাকাছি কিছু অর্জন করতে না পারেন, তাহলে বিশ্ব শক্তি হিসেবে নিজেদের মর্যাদা বাড়াতে রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা অনেকটা বেড়ে যাবে।
একাত্তর/এসজে
