ভারতের উত্তরপ্রদেশে অবস্থিত প্রাচীন শহর বারাণসী বা কাশী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি শহর। হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন, সেখানে যদি কারো মৃত্যু হয়, তহলে তিনি মুক্তি লাভ করেন।
তাই প্রতি বছর স্বেচ্ছায় মুত্যুবরণ করতে অসংখ্য হিন্দু ধর্মাবলম্বী গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটি যান। হিন্দু ধর্ম ও জৈন ধর্মের সাতটি পবিত্রতম শহরের একটি হল বারাণসী। শুধু তাই নয়, বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশেও বারাণসী শহরের বিশেষ ভূমিকা ছিলো।

বারাণসীর সংস্কৃতির সাথে গঙ্গা নদীর একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে এবং এর ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে। এই শহরটি শত শত বছর ধরে ভারতের বিশেষ করে উত্তর ভারতের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র। হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বেনারস ঘরানার জন্ম ও বিকাশ বারাণসীতেই।
বারাণসী, বেনারস বা কাশী- ভারতের উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লখনৌ শহর থেকে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রাচীন বারাণসী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই শহরকে বলা হয় ভারতের আধ্যাত্মিক রাজধানী।
বারাণসী ভারতের অতি প্রাচীন নগর। শিবের শহর, ধর্মের শহর, বোধিসত্ত্বের শহর। ভারতের শিল্পসংগীতসংস্কৃতির অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এই শহর। জ্ঞানচর্চার অতি বিশিষ্ট কেন্দ্র। ঋগ্বেদে কাশী নামে উল্লেখ আছে এই শহরের।
পুরাণমতে এই শহরটি পত্তন স্বয়ং শিবের হাতে। বারণসীকে অতি পবিত্র শহর হিসেবে মনে করা হয়। হিন্দু ধর্মালম্বীরা বিশ্বাস করেন, এই শহরে যদি কারো মৃত্যু হয়, তবে তিনি মুক্তি লাভ করেন। এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে বারাণসী শহরের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য উপাসনালয়, মন্দির, স্নান ঘাট, সাধু-সন্ন্যাসীদের নিবাস।
এসবের সমন্বয়ে পুরো শহরটি একটি প্রকৃত আধ্যাত্মিক নগরীতে পরিণত হয়েছে। প্রায় ১১ বছর আগে হায়দ্রাবাদে আরামদায়ক জীবন ছেড়ে স্ত্রীকে নিয়ে বারাণসীতে আসেন ৮২ বছরের মুরালি মোহন শাস্ত্রি। প্রাক্তন এই কলেজ শিক্ষক আশা করেন যে বারাণসীতে মারা গিয়ে তিনি মৃত্যু এবং পুণর্জন্মের ক্ষীণ চক্র ভেঙ্গে পরিত্রাণ পেতে পারেন।

তাই ২৩ হাজার মন্দিরের নগরী বারাণসীতে এসে এখন মৃত্যুর জন্য প্রহর গুণছেন তিনি। মুরালি মোগন শাস্ত্রী বলেন, মৃত্যু এখানে আমন্ত্রিত। আমরা মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানাই। এবং তিনি আসলে আমাদের অতিথি। তাই আমরা গর্বিত যে আমরা এখানে মরতে যাচ্ছি।
কাশীতে তীর্থযাত্রীদের বসবাসের জন্য যেসব কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে তাকে বলা হয় মোক্ষ নিবাস। বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা ও ব্যবসায়ীদের অর্থায়নে এসব নিবাস গড়ে তোলা হয়েছে। এসব মোক্ষ নিবাসগুলো নির্দিষ্ট শর্তে তীর্থযাত্রীদের গ্রহণ করে থাকে।

শুধু মুরালি মোহন শাস্ত্রী নয়, তার মতো আরও অসংখ্য নারী-পুরুষ কাশীর বিভিন্ন অতিথি কক্ষে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছেন। তবে মোক্ষ লাভের বিষয়টি বাস্তবে ততটা সহজ নয়। অনেকে এখানে এসে আমৃত্যু অপেক্ষা না করতে পেরে প্রস্থান করেন।
অনেকে আবার এখানে আসলেও যথার্থ উপাসনা করে ঈশ্বরকে প্রসন্ন করতে ব্যর্থ হন। তবুও কাশী বা বারাণসীকে ঘিরে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। হিন্দু ধর্মের অনুসারীদের পাশাপাশি অসংখ্য ভ্রমণপিপাসু মানুষ প্রতি বছর এই নগরী পরিদর্শন করতে যান।
অনেক মহান ব্যক্তিত্ব সময়ে সময়ে কাশীতে বসবাস করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মহর্ষি অগস্ত্য, ধন্বন্তরী, গৌতম বুদ্ধ, সাধু কবির, অঘোরাচার্য বাবা কানিরাম, রানী লক্ষ্মীবাই, পাণিনি, পার্শ্বনাথ, পতঞ্জলি, সন্ত রাইদাস, স্বামী রামানন্দাচার্য, বল্লভাচার্য, শঙ্করাচার্য, গোস্বামী তুলসীদাস, বেদব্যাস।

একাত্তর/এআর
