ইউক্রেনের অনুরোধ মেনে নিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণে তাদেরকে ক্লাস্টার বোমা সরবরাহ করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ১০০টিরও বেশি দেশ এই অস্ত্রটি নিষিদ্ধ করায় মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে।
ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র কী?
ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র হলো রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র বা আর্টিলারি শেল থেকে বিপুল সংখ্যক ছোট ছোট বোমা বিচ্ছুরণ করার একটি পদ্ধতি, যা বোমাগুলোকে একটি বিস্তৃত এলাকাজুড়ে বাতাসে ছড়িয়ে দেয়।
এগুলো কোনো কিছুর সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে বিস্ফোরিত হওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়। তবে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বোমাই হলো ‘ডাডস’, যেগুলো প্রাথমিকভাবে বিস্ফোরিত হয় না, বিশেষত ভেজা বা নরম মাটিতে অবতরণ করলে।
পরে কেউ তুলে নিলে বা মাড়ালে সেগুলো বিস্ফোরিত হয়, যার ফলে ওই ব্যক্তি নিহত, বা পঙ্গুত্ব বরণ করতে পারেন।
সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে, পরিখা এবং সুরক্ষিত অবস্থানে স্থল সৈন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হলে এগুলো ভয়ঙ্করভাবে কার্যকর হতে পারে, যা সাবধানে অপসারণ না করা পর্যন্ত বড় এলাকাগুলোকে ঘোরাফেরা করার জন্য খুব বিপজ্জনক করে তোলে।
কেনো এগুলো নিষিদ্ধ?
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং জার্মানিসহ ১০০টিরও বেশি দেশ ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রের কনভেনশন নামের একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি সই করেছে। বেসামরিক জনগণের উপর প্রভাবের কারণে এই চুক্তি ক্লাস্টার অস্ত্রের ব্যবহার বা মজুদকে বেআইনি করে।
এই বোমার কারণে বিশেষ করে শিশুরা ঝুঁকিতে থাকে, কারণ এগুলো আবাসিক বা কৃষিজমি এলাকায় রেখে যাওয়া ছোট খেলনার মতো হতে পারে, এবং প্রায়শই শিশুরা কৌতূহলবশত এগুলো তুলে নেয়।
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো ক্লাস্টার অস্ত্রকে ‘ঘৃণ্য’ এবং এমনকি যুদ্ধাপরাধ হিসাবে বর্ণনা করেছে।
কারা এখনও এগুলো ব্যবহার করে?
রাশিয়া এবং ইউক্রেন উভয়ই ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণ-স্কেল আক্রমণ শুরুর পর থেকে ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করছে।
এই দুই দেশের একটিও ক্লাস্টার বোমা নিষিদ্ধ করার চুক্তিতে সই করেনি। যুক্তরাষ্ট্রও করেনি, তবে তারা এর আগে রাশিয়ার ব্যাপকভাবে এই অস্ত্র ব্যবহারের সমালোচনা করেছে।
রাশিয়ান ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রের ‘ডাড রেট’ প্রায় ৪০ শতাংশ, যার অর্থ এদের একটি বড় অংশ স্থলে বিপদ হিসেবে থেকে যায়, যেখানে গড় ডাড রেট ২০ শতাংশের কাছাকাছি বলে মনে করা হয়।
পেন্টাগন অনুমান করে, তার নিজস্ব ক্লাস্টার বোমার ডাডের হার তিন শতাংশের কম।

কেনো ইউক্রেন ক্লাস্টার বোমা চাইছে?
ইউক্রেনীয় বাহিনীর আর্টিলারি শেলের মজুদ দ্রুতই ফুরিয়ে আসছে, কেননা রাশিয়ানদের মতো তারাও অত্যধিক হারে এগুলো ব্যবহার করে। ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্ররাও যথেষ্ট দ্রুতগতিতে তাদেরকে আর্টিলারি সরবরাহ করতে পারে না।
দক্ষিণ এবং পূর্ব ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে কামান একটি প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
ইউক্রেনীয়রা এখন হাজার কিলোমিটার যুদ্ধক্ষেত্র বরাবর প্রসারিত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে রাশিয়ানদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে।
পর্যাপ্ত আর্টিলারি শেলের অভাবে ইউক্রেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রের সরবরাহ পুনরায় মজুত করতে বলেছে, যাতে রাশিয়ান পদাতিক বাহিনীকে লক্ষ্য করে সেই সমস্ত প্রতিরক্ষামূলক পরিখায় আক্রমণ করা যায়।
তবে এটি ওয়াশিংটনের জন্য মোটেও সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। অনেক ডেমোক্র্যাট এবং মানবাধিকার সমর্থকদের কাছে এটি গভীরভাবে অজনপ্রিয়, যা নিয়ে অন্তত ছয় মাস ধরে বিতর্ক চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত কী প্রভাব ফেলবে?
এই যুদ্ধে ওয়াশিংটন যে নৈতিক ভূমিকায় আছে অবিলম্বে তার অনেকটাই হুমকির সম্মুখীন হবে।
রাশিয়ার অসংখ্য কথিত যুদ্ধাপরাধ ভালোভাবে নথিভুক্ত, কিন্তু এই পদক্ষেপের ফলে মার্কিনীদের বিরুদ্ধে ভণ্ডামির অভিযোগ আনার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: ইউক্রেনকে নিষিদ্ধ ক্লাস্টার বোমা দেবে যুক্তরাষ্ট্র
ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র হলো একটি জঘন্য, নির্বিচারে হত্যার অস্ত্র যা সঙ্গত কারণে বিশ্বের অনেক দেশে নিষিদ্ধ।
এই মার্কিন পদক্ষেপ অনিবার্যভাবে এটিকে তার পশ্চিমা মিত্রদের সাথে কিছুটা মতবিরোধের দিকে ঠেলে দেবে, এবং ঠিক এই বিভক্তিই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চান।
একাত্তর/এসজে
