কারাগারে থাকা রাশিয়ার বিরোধী নেতা আলেক্সেই নাভালনির মৃত্যুকে ঘিরে ক্রমেই রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে। রুশ কর্তৃপক্ষ বলছে, শুক্রবার আর্কটিক সার্কেলের উত্তরে একটি কারাগারে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হওয়ার পর তার মৃত্যু হয়েছে। তবে কারা কর্তৃপক্ষের এমন বক্তব্যে মানতে পারছেন না অনেকেই।
রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিনের সবচেয়ে কট্টর বিরোধী নেতা হিসেবে প্রায় এক দশক আগে আলোচনায় আসেন নাভালনি। ৪৭ বছর বয়সী এই বিরোধী নেতা পুতিন ও ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে আন্দোলন করে আসছিলেন। এর জন্য তাঁকে শেষ পর্যন্ত চরম মূল্য দিতে হলো কি-না, সেই নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
২০২০ সালের আগস্টে সাইবেরিয়ায় নাভালনিকে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছিল বলে অভিযোহ করা হলেও সেটি আমলে নেয়নি ক্রেমলিন। হত্যাচেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করে রুশ কর্তৃপক্ষ বলেছিল, তাকে নার্ভ এজেন্ট দিয়ে বিষপ্রয়োগের কোনো প্রমাণ নেই। এরপরই নাভালনি স্বেচ্ছা নির্বাচনে চলে যান।
২০২১ সালে জার্মানি থেকে স্বেচ্ছায় রাশিয়ার ফেরার পর আবারও শিরোনামে আসেন নাভালনি। জার্মানিতে পরীক্ষায় দেখা গেছে, তাকে নার্ভ এজেন্ট দিয়ে বিষপ্রয়োগের চেষ্টা করা হয়েছিল। সেসব ভুলে তিনি আবার পুতিন বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন এবং রাজপথে ব্যাপক বিক্ষোভ করতে সমর্থ হয়েছিলেন।

পুতিন তাঁকে এতটাই অপছন্দ করতেন যে প্রকাশ্যে তাঁর নামও নিতেন না। তাঁকে অনেকবার আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। গৃহবন্দীও থাকতে হয়েছে। রুশ কর্তৃপক্ষ তাঁর ব্যাংক হিসাবও জব্দ করে। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে নাভালনিকে কারাগারে রাখা হয়।
নাভালনির বিরুদ্ধে ১৪টি মামলা করা হয়। সব মিলিয়ে তাঁর ৩৫ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। গেলো বছরে তাঁর আইনজীবী বলেন, নাভালনি আশঙ্কা করছেন, কারাগারে তাঁকে ধীরে ধীরে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হতে পারে। কারণ, তিনি পেটে ব্যথা অনুভব করেন। দ্রুত তাঁর ওজন কমছিলো।
শেষ পর্যন্ত কি সেই আশাঙ্কাই সত্যি হলো? মস্কো থেকে এক হাজার ৯০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত কারাগারে নাভালনির মৃত্যুর পর কর্তৃপক্ষ জানায়, অসুস্থবোধ করার পরপরই নাভালনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। চিকিৎসাকর্মীরা দ্রুতই উপস্থিত হন এবং একটি অ্যাম্বুলেন্সও ডাকা হয়। কিন্তু সব আয়োজনই বৃথা যায়।
কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষের এমন কথায় চিড়ে ভিজছে না। নাভালনির মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে জল্পনা-কল্পনা। পুতিন কি তাঁর এক নম্বর শত্রুকে রাস্তা থেকে সরানোর জন্য কোনও মোক্ষম চাল চেলেছেন? জেলের মধ্যেই কি তাঁর উপর বিষপ্রয়োগ করা হয়েছে, এসব প্রশ্নই ঘুরে ফিরে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছাড়াও পুতিনের উপর ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন অ্যালেক্সি নাভালনির স্ত্রীও।

বাইডেন হুশিয়ারী দিয়েছেন, এই মৃত্যুর জন্য পুতিনকে এর পরিণতি ভোগ করতে হবে। ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলাও কড়া ভাষায় বলেছেন, নাভালনির মৃত্যু নিশ্চিত হলে তা হবে পুতিনের নিষ্ঠুরতার আরও একটি নিদর্শন।
কম যাননি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও। তিনি বলেছেন, নাভালনিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হত্যা করেছেন। নির্যাতনের শিকার হাজার হাজার মানুষের মতো নাভালনিও পুতিনের হাতে নিহত হয়েছেন। এর জন্য পুতিনকে জবাবদিহি করতে হবে বলেও হুশিয়ারী দেন তিনি।
আর, পুতিনের কাছে স্বামী নাভালনির মৃত্যুর জবাব চেয়েছেন স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনায়া। তিনি বলেন, পুতিন ও তার পুরো দল এবং তার সব বন্ধুরা জানুক যে তারা আমাদের দেশ, আমার পরিবার এবং আমার স্বামীর প্রতি কী করেছে। আমি পুতিনের কাছে জবাব চাই। সেই দিন খুব তাড়াতাড়ি আসবে।
মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে শুক্রবার নাভালনির মৃত্যুসংবাদ পান তাঁর স্ত্রী। কান্না সংবরণ করে আবেগতাড়িত বক্তব্যে তিনি বলেন, এই খবর কীভাবে বিশ্বাস করব জানি না। কারণ, বহু বছর ধরেই আমরা পুতিন ও তার সরকারকে বিশ্বাস করতে পারি না। তারা সব সময় মিথ্যা বলে।
স্ত্রী ইউলিয়া ও নাভালনির সংসারে আছে এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের নাম দারিয়া ও ছেলের নাম জাহার। সাবেক সেনা কর্মকর্তার সন্তান নাভালনি নিজের দেশকে ভালোবাসতেন। রাশিয়ার দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থার কড়া সমালোচক ছিলেন তিনি। তবে ক্রেমলিনের চোখে তিনি ছিলেন মার্কিন গোয়েন্দাদের চর।
