ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার এক চতুর্থাংশ মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে আছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। গাজায় জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা- ওসিএইচএ বলছে, মানবিক সংস্থাগুলোকে গাজায় প্রবেশে বাধা দিচ্ছে ইসরাইলি দখলদার বাহিনী। এদিকে, ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইল বাহিনীর হামলায় ৯৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
নারকীয় জীবন কাটছে গাজার বাসিন্দাদের। অব্যাহত ইসরাইলি হামলায় বেঁচে থাকার জন্য দিগ্বিদিক ছুটে চলা, স্বজনহারাদের কান্না আর চরম ক্ষুধায় শুকিয়ে যাওয়া মুখ, এসবই এখন সেখানকার বাস্তবতা। সামান্য ত্রাণের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা সবার। তাদেরই একজন আবু সানাদ।
তিনি বলেন, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি একটু ময়দার জন্য। খালি হাতে ফেরার কোন সুযোগই নেই। কারণ, বাচ্চাদের না খেয়ে মরতে দেখার আগে নিজেই মরে যাওয়া ভালো। তার এমন কথাতেই স্পষ্ট যে, গাজার মানবিক সংকট কতটা ভয়ংকর অবস্থায় রয়েছে।
এরপরও গাজা ভূখণ্ডে অবিরাম হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইলি হায়েনারা। স্কুল, শরণার্থী শিবির, মসজিদ, গির্জার পাশাপাশি হামলা হচ্ছে হাসপাতালেও। এতে করে গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়েছে। এর সঙ্গে অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডটিতে দেখা দিয়েছে তীব্র মানবিক সংকট।
এ অবস্থায় দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে গাজার লাখো মানুষ। জাতিসংঘ বলেছে, গাজার এক-চতুর্থাংশ মানুষ দুর্ভিক্ষ থেকে মাত্র একটি ধাপ দূরে। গাজায় জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা-ওসিএইচএ বলছে, ইসরাইলি সেনাবাহিনীর বাধার মুখে মানবিক সংস্থাগুলো গাজায় ত্রাণ নিয়ে প্রবেশ করতে পারছে না। এ সময় ত্রাণবাহী ট্রাকগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
বুধবার এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘ বলেছে, গাজা উপত্যকায় কমপক্ষে ৫ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে আছে বলে তাদের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মঙ্গলবার নিরাপত্তা পরিষদকে জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, কোনও পদক্ষেপ নেয়া না হলে গাজায় ব্যাপক দুর্ভিক্ষ ‘প্রায় অনিবার্য’।
ইউএনওসিএইচএ-এর কোঅর্ডিনেশন ডিরেক্টর রমেশ রাজাসিংহাম বলেছেন, এভাবে সংঘাত চলতে থাকলে এবং গাজার দক্ষিণে জনাকীর্ণ এলাকায়ও যখন সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে তখন মানবিক বিষয়ক সমন্বয়ের কাজ খুব কমই সম্ভব হবে।
তিনি নিরাপত্তা পরিষদকে আরও বলেন, গাজার উত্তরাঞ্চলে ২ বছরের কম বয়সী প্রতি ছয় শিশুর মধ্যে এক শিশু তীব্র অপুষ্টির শিকার এবং ফিলিস্তিনি এই ভূখণ্ডের ২৩ লাখ মানুষই কার্যত বেঁচে থাকার জন্য বর্তমানে ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে অপর্যাপ্ত’ খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভর করছে।
রাজাসিংহাম আরও বলেন, গাজায় জাতিসংঘ ও দাতাদের ন্যূনতম সহায়তা সরবরাহ পেতেও অপ্রতিরোধ্য বাধার মুখে পড়ছে। এর মধ্যে ক্রসিং বন্ধ, চলাচল ও যোগাযোগের ওপর বিধিনিষেধ, কঠোর পরীক্ষা পদ্ধতি, অস্থিতিশীলতা, ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা এবং অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের মতো বিষয় রয়েছে।
মঙ্গলবার অনাহারে থাকা গাজাবাসীর জন্য বিমান থেকে ত্রাণ সহায়তা ফেলেছে জর্ডান বিমানবাহিনীর কর্মীরা। এতে সরাসরি অংশ নিয়েছেন জর্ডানের রাজা দ্বিতীয় আব্দুল্লাহ। বিমান থেকে প্যারাসুটের মাধ্যমে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে দ্বিতীয়বারের মত অংশ নিলেন তিনি।
তবে, গাজার মানবিক পরিস্থিতির উন্নতির জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে দাবি করেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরাইলের ডেপুটি অ্যাম্বাসেডর জোনাথন মিলার। তার দাবি, সাহায্যের পরিমাণ এবং তা বিতরণের গতির বিষয়ে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো আসলে জাতিসংঘ এবং অন্যান্য সংস্থার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।
উল্লেখ্য, গত ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন আন্তঃসীমান্ত হামলার পর থেকে ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় অবিরাম বিমান ও স্থল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলি এই হামলায় হাসপাতাল, স্কুল, শরণার্থী শিবির, মসজিদ, গির্জাসহ হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে।
গাজা ভূখণ্ডের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। এছাড়া আহত হয়েছেন আরও প্রায় ৭০ হাজার মানুষ। এছাড়া ইসরাইলি আগ্রাসনের কারণে প্রায় ২০ লাখেরও বেশি বাসিন্দা তাদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
