হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির উত্তরসূরি হতে আর কোন বাধাই রইলো না দেশটির মধ্যপন্থী সংস্কারবাদী নেতা মাসুদ পেজেকশিয়ানের সামনে। দুই দফায় অনুষ্ঠিত ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে দেশটি সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী স্তর অভিভাবক পরিষদ।
এর ফলে ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসাবে পেজেশকিয়ানের শপথ নেয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গেলো। রোববার ইরানের অভিভাবক পরিষদের মুখপাত্র হাদি তাহান নাজিফ বলেন, কিছুক্ষণ আগেই শেষ হয়েছে নির্বাচনের বৈধতা পরীক্ষা করার প্রক্রিয়া শেষ।
তিনি আরও জানান, অভিভাবক পরিষদের সদস্য কয়েক ঘন্টা ধরে দুই দফার নির্বাচন যাচাই করে দেখেছেন এবং ইরানের ১৪তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার বৈধতাও নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সর্বোচ্চ স্তরের সিদ্ধান্ত এরিমধ্যে তেহরানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়কে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
তাহান নাজিফ আরও জানিয়েছেন, দ্বিতীয় দফার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই প্রার্থী, পেজেশকিয়ান এবং সাঈদ জালিলির মধ্যে কেউই ১২ সদস্যের এই নির্বাচনী তদারকি সংস্থার কাছে কোনও অভিযোগ করেননি। পরিষদ এখন তাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনির কাছে পাঠাবে।
এরপর ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাঈদ আলী খামেনির কার্যালয় নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ নেয়ার তারিখ ঘোষণা করবে। তারপর পেজেশকিয়ান আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসাবে তার চার বছরের মেয়াদ শুরু করবেন বলে উল্লেখ করেছেন তাহান নাজিফ।
আইন অনুযায়ী, ইরানে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টদের আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে সংসদে শপথ নিতে হয়। সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, ৪ বা ৫ আগস্ট প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে পারে। এর পর প্রেসিডেন্ট তার প্রস্তাবিত মন্ত্রীদের আস্থা ভোটের জন্য সংসদে উপস্থাপনের জন্য ১৫ দিন সময় পাবেন।
পেজেশকিয়ান শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির স্থলাভিষিক্ত হতে কট্টর রক্ষণশীল সাঈদ জালিলির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনেও বিজয়ী হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন এক কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০৩ ভোট। অন্যদিকে, জালিলির প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা এক কোটি ৩৫ লাখ ৩৮ হাজার ১৭৯।
৬৯ বছরের মাসুদ পেজেশকিয়ান ইরানের পার্লামেন্টে ২০০৮ সাল থেকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাবরিজ শহরের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন। ইরানের প্রধান সংস্কারপন্থী জোট তাকে সমর্থন দিয়েছে। সাবেক দুই সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি ও হাসান রুহানিরও সমর্থন পেয়েছেন তিনি।
পেজেশকিয়ান ইরানের দেশটির পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশের বাসিন্দা। তিনি ১৯৫৪ সালে মাহাবাদ শহরে জন্ম নেন। তার বাবা ইরানি-আজেরি ও মা ইরানি-কুর্দি। পেজেশকিয়ান জেনারেল মেডিসিনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্র থাকার সময় তিনি পাহলভি শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবীদের দলে ভিড়েছিলেন।
মাসুদ পেজেশকিয়ান ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন। তার ওপর দায়িত্ব ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে চিকিৎসাকর্মীদের দেখভাল করা। ১৯৯৪ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী ও এক সন্তান হারান তিনি। পরে আর বিয়ে করেননি। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়েই আঝেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট খাতামির শাসনামলে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন পেজেশকিয়ান। ২০১৩ ও ২০২১ সালেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন। তবে ২০১৩ সালে তিনি হাসেমি রাফসানজানিকে সমর্থন দিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন এবং ২০২১ সালে গার্ডিয়ান কাউন্সিল তার প্রার্থিতা বাতিল করে।
ইরানের ক্ষমতা বেশ কয়েক বছর ধরে রক্ষণশীলদের হাতে রয়েছে। তবে পেজেশকিয়ান মনোনয়ন পাওয়ায় সংস্কারপন্থিরা আশার আলো দেখছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মাসুদ পাজেশকিয়ান এমন একজন ব্যক্তি, যাকে বিশ্বশক্তি স্বাগত জানাবে এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে মতবিরোধ কমিয়ে আনতে পারবেন।
জালিলির মতামত নিলেন ইরানের নতুন কান্ডারি