ফ্রান্সে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া নজিরবিহীন দাঙ্গা, ভাঙচুর ও লুটপাটের জন্য ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ উগ্র-বামপন্থী গোষ্ঠী ও দুষ্কৃতীদের দায়ী করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। একই সাথে আগামী দিনগুলোতে সব ধরনের ‘অবৈধ’ ও অনুমোদনহীন বিক্ষোভ কর্মসূচি পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন তিনি।
গোয়েন্দা প্রধান ও জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক শেষে বৃহস্পতিবার এক ভাষণে ম্যাক্রোঁ বলেন, গত শনিবার উগ্র-বামপন্থী দলগুলো রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রদ্রোহমূলক আচরণ করেছে, যাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রকে ভেঙে ফেলা। তিনি জানান, ট্রেড ইউনিয়নগুলোর মতো নিবন্ধিত সংস্থাগুলোর নিয়মমাফিক মিছিল বা সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক এলাকা সুরক্ষার স্বার্থে সেগুলোর চলাচলের বিকল্প পথ নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।

গত ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সে বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা ও নগর অস্থিরতা প্রত্যক্ষ করে বিশ্ব। ক্ষুব্ধ জনতার একাংশের তাণ্ডব সামলাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিমশিম খাওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন উঠেছে। সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে লিমোগেস সিটি হলে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ইতোমধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ।
নতুন করে সহিংসতা ছড়ানোর আশঙ্কায় দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর লিঁওতে আগামী শনিবারের নির্ধারিত সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। অন্যদিকে রাজধানী প্যারিসেও বৃহস্পতিবারের একটি ছাত্র বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত জমায়েত এড়াতে প্রধান প্রধান মেট্রো স্টেশনগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও, সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় প্যারিসের মূল বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর ব্যবসায়ীরা দোকানের কাঁচের জানালা ও শোরুম কাঠের তক্তা দিয়ে ঢেকে দিচ্ছেন। লাক্সারি ব্র্যান্ড ‘হার্মিস’ তাদের ফরাসি স্টোরগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।

প্যারিসের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলীয় শহর ওরলিন্সেও চরম উত্তেজনার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে ডানপন্থী ‘ন্যাশনাল র্যালি’র বার্ষিক সভার পাশাপাশি বামপন্থী ও বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন পাল্টা বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। অন্যদিকে ফরাসি শিক্ষার্থীদের প্রধান সংগঠন ‘ইউএনইএফ’ এবং ২০১৮ সাল থেকে সক্রিয় সরকারবিরোধী ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারীরা চলতি সপ্তাহান্তেই প্যারিসসহ বড় শহরগুলোতে ফের রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অস্থিরতার পেছনে রয়েছে দেশটির গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট। জ্বালানির আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় সেবার অবনতি তরুণ ও কর্মজীবী মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছে। ফরাসি রাজনীতিতে এখন দোষারোপের খেলা চরম আকার ধারণ করেছে, যেখানে সরকার উগ্র-বামপন্থীদের উসকানি দেয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করছে। বিনিয়োগকারীদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে বৃহস্পতিবার ফরাসি ১০ বছর মেয়াদী সরকারি বন্ডের সুদের হার ২০১৩ সালের পর প্রথমবারের মতো মার্কিন ট্রেজারির চেয়েও ওপরে উঠে গেছে, যা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকেই স্পষ্ট করে তোলে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
