ইতালির বাণিজ্যিক রাজধানী মিলানসহ উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলোতে তরুণদের ব্যাপক ভাঙচুর, দোকান লুটপাট ও পুলিশের ওপর রক্তক্ষয়ী হামলার পর কঠোর অবস্থানে নেমেছে জর্জিয়া মেলোনির সরকার। বিক্ষোভের নামে নজিরবিহীন সহিংসতা দমনে মঙ্গলবার একগুচ্ছ নতুন নিরাপত্তা অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে ইতালি সরকার। নতুন এই আইনে সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের জন্য কঠোর শাস্তির পাশাপাশি অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ভাঙচুর ও লুটপাটের জন্য তাঁদের মা-বাবা বা অভিভাবকদের আর্থিক দায়িত্ব নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন এই অধ্যাদেশের বিস্তারিত তুলে ধরে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলেনি বলেন, দোকানপাট ভাঙচুর ও চুরি করার মধ্যে কোনো বিপ্লব বা বীরত্ব নেই। ভাঙচুর আর চুরি করা কোনো প্রতিবাদ নয়, এটা স্রেফ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।

অবিলম্বে কার্যকর হওয়া এই নিরাপত্তা প্যাকেজের আওতায়, বিক্ষোভে অন্তত পাঁচজনের গ্রুপে অংশ নিয়ে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার ইউরো (প্রায় পৌনে ২৭ লাখ টাকা) পর্যন্ত জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। মুখ ঢেকে অপরাধ করলে কিংবা কাউকে আহত করলে শাস্তির মাত্রা আরও বাড়বে। এ ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের ক্ষেত্রে দ্রুত আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পুলিশকে, যেখানে সরাসরি অর্থ পরিশোধ করতে হবে অভিভাবকদের। শুধু তা-ই নয়, অপরাধ সংঘটিত করার আগেই বিপজ্জনক মনে হলে ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোরদেরও আগাম আটকে রাখার নজিরবিহীন ক্ষমতা পেয়েছে পুলিশ।
আগামী শনিবারে নতুন করে বিক্ষোভের যে ডাক দেওয়া হয়েছে, তা সামাল দিতে এবং স্পর্শকাতর স্থানগুলোর নিরাপত্তা বজায় রাখতে ইতালির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত মিলানের রাজপথে পুলিশের পাশাপাশি ৫০০ সেনা সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

প্রতিবেশী ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রতিক তীব্র সহিংস দাঙ্গার মতোই ইতালির উত্তরাঞ্চলের এসব ঘটনা ভাবিয়ে তুলেছে দেশটির নীতিনির্ধারকদের। ২০২২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মেলোনি একের পর এক কঠোর নিরাপত্তা আইন পাস করেছেন। যদিও সমালোচকদের মতে, অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা মোকাবিলার নামে এসব পদক্ষেপ সমাজের মূল সমস্যা দূর করতে পারছে না। বিগত চার বছরে ইতালির জেলখানায় কয়েদির সংখ্যা ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের সহিংসতার পাশাপাশি ইতালির দক্ষিণাঞ্চলেও সরকার বড় সংকটের মুখোমুখি। জ্বালানি তেলের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি ও আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে ট্রাক চালকরা রাজপথ অবরুদ্ধ করে দেওয়ায় সার্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফলে কাঁচামালের অভাবে একাধিক পাস্তা তৈরির কারখানা উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে এবং পচে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে বিপুল পরিমাণের ফলমূল ও শাকসবজি।

উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চল- দুই প্রান্তের আন্দোলনকারীদেরই মূল ক্ষোভ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য নিয়ে। ২০২৭ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এই জনরোষ মেলোনি সরকারের জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্দোলনের পটভূমি স্বীকার করলেও কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মেলোনি বলেন, চাকরি খোঁজার কষ্ট কিংবা সীমিত আয়ে ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখার যন্ত্রণা আমরা বুঝি। কিন্তু কোনো কষ্ট বা ক্ষোভই রাজপথে সহিংসতার অজুহাত হতে পারে না।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
