সাহিত্য ও দর্শনের বিশাল অনুরাগী ছিলেন ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর ব্যক্তিগত পাঠাগারের তথ্য সামনে আসতেই বেরিয়ে এসেছে এনিয়ে চমকপ্রদ সব তথ্য। দেশটির মেহর নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনির ব্যক্তিগত পাঠাগারটি ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং তিনি নিজেই এর বিন্যাস ও তদারকি করতেন।

তেহরানে নেতার পুরনো বাসভবনে রেকর্ড করা একটি সাক্ষাৎকারে খামেনির স্ত্রীর ভাই হাসান খোজাস্তেহ এই ব্যক্তিগত পাঠাগারটি অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই পাঠাগারটি বিভিন্ন বিষয়ের বইয়ের ওপর খামেনির গভীর পান্ডিত্য ও জানাশোনার প্রতিফলন।
খোজাস্তেহ জানান, লাইব্রেরিটিতে এক বিশেষ ধরনের শৃঙ্খলা বজায় রাখা হতো। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সব বই অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে শ্রেণিবদ্ধ ছিল। যখন কারও কোনো বইয়ের প্রয়োজন হতো, তিনি (খামেনেই) সঙ্গে সঙ্গে বলে দিতে পারতেন সেটি কোন তাকের কোথায় আছে। তিনি আরও যোগ করেন, পুরো সংগ্রহটির ওপর নেতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও দখল ছিল।

তার মতে, এই পরিচিতির মূলে ছিল একটি বিশেষ কারণ, পূর্ববর্তী স্থান থেকে বইগুলো সরিয়ে আনার পর আয়াতুল্লাহ খামেনি নিজেই সেগুলো গুছিয়েছিলেন। খোজাস্তেহ বলেন, যখন বক্স ভরে বইগুলো আনা হচ্ছিল, তিনি নিজেই সেগুলো সাজিয়েছিলেন অথবা নির্দেশ দিয়েছিলেন কোনটি কোথায় রাখতে হবে। এভাবেই এটি একটি বিশাল ও সুসংগঠিত পাঠাগারে পরিণত হয়।
তিনি আরও জানান, সংগ্রহটিতে উপন্যাসের পাশাপাশি রাজনৈতিক সাহিত্য, ঐতিহাসিক গবেষণা, ধর্মীয় সেমিনারির পাঠ্য এবং কবিতা ও সাহিত্যের এক বিশাল সম্ভার ছিল।

পাঠাগার থেকে বই ধারের ক্ষেত্রে একটি মজার পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেন খোজাস্তেহ। সংগ্রহের স্থিরচিত্রে একটি লাল নোটবুক দেখা যায়, যা মূলত ধার নেওয়া বইয়ের হিসাব রাখার জন্য ব্যবহৃত হতো। তিনি বলেন, যে কেউ বই নিলে তাকে এই খাতায় বইয়ের নাম লিখে রাখতে হতো যাতে পরবর্তীতে তা ফেরত পাওয়া যায়। যেহেতু এই খাতাটি মূলত পরিবারের সদস্যরাই ব্যবহার করতেন, তাই এটি পুনরায় খুঁজে পাওয়া গেলে সেখানে অনেক আকর্ষণীয় নোট পাওয়া যেতে পারে।
খোজাস্তেহ নিজের স্নাতকোত্তর পড়াশোনার সময় এই পাঠাগার থেকে ব্যক্তিগতভাবে উপকৃত হওয়ার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, যেমন, আমার মাস্টার্স থিসিসের সূত্রের জন্য যখন আমি হোভেইজেহ সম্পর্কিত কাসরাভির ঐতিহাসিক কাজগুলো খুঁজছিলাম, তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন, বইগুলো তার কাছে আছে। আমি আমার গবেষণার জন্য সেই বইগুলো থেকে প্রভূত সাহায্য পেয়েছিলাম।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক মর্মান্তিক ঘটনায় ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত হামলায় শাহাদাতবরণ করেন। মধ্য তেহরানে তার দপ্তরে এই হামলা চালানো হয়। তার এই শাহাদাত শুধু ইরানেই শোকের ছায়া ফেলেনি, বরং পুরো মুসলিম বিশ্বে গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
আয়াতুল্লাহ খামেনেই শুধু আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাবশালী একজন নেতা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বও। অনেক ইরানির কাছে তার অবদান রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত ছিল। সংস্কৃতি, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল, যা তিনি সারাজীবন লালন করেছেন। তার ভাষণগুলোতে প্রায়ই বই ও কবিতার প্রতি তার ভালোবাসার প্রতিফলন দেখা যেত, যেখানে তিনি সমাজ গঠন ও আত্মিক বিকাশে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার গুরুত্বের ওপর জোর দিতেন।

জনসাধারণের উদ্দেশে দেয়া ভাষণে আয়াতুল্লাহ খামেনেই প্রায়ই মহান কবি ও চিন্তাবিদদের উদ্ধৃতি দিতেন। তিনি দেখাতেন কীভাবে সাহিত্য প্রতিরোধ ও আত্মোপলব্ধির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। পারস্য কবিতার প্রতি তার এই টান অনেক মানুষের হৃদয়ে নাড়া দিত এবং জাতীয় গর্ব ও সাংস্কৃতিক পরিচয়বোধকে জাগ্রত করত। একজন পণ্ডিত ও চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি বিশ্বাস করতেন, জাতির নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতির জন্য শিল্প ও দর্শনের সাথে সম্পৃক্ত থাকা অপরিহার্য।
