জুমার খুতবার মিম্বর থেকে শুরু করে রাজপথের বিক্ষোভে- ইরানের ধর্মীয় নেতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের মুখে এখন একটাই জোরালো সুর; আর তা হলো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পক্ষে সোচ্চার হওয়া। এক সময় দেশটির কট্টরপন্থীদের একান্ত নিজস্ব অবস্থান বলে বিবেচিত হলেও, বর্তমান সময়ে এই দাবি ইরানের মূলধারার জনপরিসরে এক প্রবল আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
কয়েক দশক ধরে তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করে এলেও, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক ধাক্কা ও যুদ্ধের মুখে এই নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে, যার সুদূরপ্রসারী পরিণতি হতে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, সম্প্রতি ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কুহদাশতের জুমার নামাজের ইমাম আলী সেপাহভান্দকে এক ভিডিওতে প্রকাশ্যে বলতে শোনা যায়, আমাদের অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত হতে হবে, যাতে আমরা শক্তি নিয়ে অপরাধী আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়তে পারি। ইনশা আল্লাহ।
ওই সময় হলরুমে টানানো গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় নিহত সামরিক কমান্ডারদের প্রতিকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে মুসল্লিরা সমস্বরে স্লোগান তোলেন, পারমাণবিক প্রতিরোধ আমাদের অবিচ্ছেদ্য অধিকার!
বিশ্লেষকদের মতে, এমন একসময়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির এই দাবি জোরালো হচ্ছে যখন ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে নতুন করে সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে।
এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জারি করা একটি ফতোয়ার ওপর নির্ভর করে দেশটি পারমাণবিক বোমা তৈরি থেকে বিরত ছিল। ওই ধর্মীয় নির্দেশনায় সামরিক বাহিনী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসসহ (আইআরজিসি) সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন থেকে কঠোরভাবে বারণ করা হয়েছিল।

তবে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মহলের দীর্ঘদিনের সন্দেহ ছিল যে, ফতোয়া সত্ত্বেও ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়িয়ে বোমা তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। এই হুমকি সামাল দিতেই ২০১৫ সালে পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে পরমাণু চুক্তি (জেসিপিওএ) সই হয়েছিল, যা থেকে পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন।
আঞ্চলিক বিশ্লেষক ও আমওয়াজ মিডিয়ার সম্পাদক মোহাম্মদ আলী সাবানির মতে, প্রয়াত খামেনির কৌশল ছিল পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সচেতনভাবে এক অস্পষ্টতার বেড়াজালে রাখা। এর মাধ্যমে তিনি ইরানকে সরাসরি পারমাণবিক শক্তিধর না করেও সম্ভাব্য হামলা থেকে বাঁচানোর আশা করেছিলেন।
কিন্তু ২০২৫ সালের জুন থেকে শুরু হওয়া সংঘাত এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে খামেনির নিজের মৃত্যুর পর সেই হিসাব সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। সাবানি বলেন, খামেনি এমন এক অবস্থা তৈরি করেছিলেন যেখানে ইরান পুরোপুরি পারমাণবিক অস্ত্রের মালিকও ছিল না, আবার সেই অবস্থান থেকে সরেও আসেনি। ফলে যে বোমা তাদের ছিল না, সেটির জন্যই তাদের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যও তেহরানের এই মানসিকতাকে তরান্বিত করেছে। গত সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প এক সম্মেলনে বলেছিলেন, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে তিনি বোমাবাজি না করে বরং সর্বোচ্চ নেতাকে ফোন করে খোঁজখবর নিতেন।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের হামলার পর থেকেই পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা ‘এনপিটি’ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার দাবি তীব্রতর হয়েছে। শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ী সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে আগের নীতি বহাল রাখা হবে কি না, তা নিয়ে ইরানের নীতিনির্ধারকরা এখন নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনা করছেন।
তেহরানের পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ঘাদেরির মতে, একসময় এনপিটি ত্যাগের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিরা সংখ্যালঘু হলেও এখন তারা সংখ্যাগরিষ্ঠে পরিণত হয়েছেন।
তাদের স্পষ্ট যুক্তি হলো, মার্কিন ও ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসন ঠেকাতে এই আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ডনের গবেষক ওমিদ মেমারিয়ানের মতে, কাতার যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এই পরমাণু কার্ড খেলে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে চাইছে ইরান। তাদের বার্তা পরিষ্কার, আলোচনা ব্যর্থ হলে তারা ভিন্ন পথে হাঁটবে এবং তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বড় মূল্য দিতে হবে।
তবে ইরানের ভেতরে এখনও সংস্কারপন্থীরা শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক নীতির পক্ষে অবস্থান ধরে রেখেছেন। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির মতো নেতারা মনে করছেন, এই পথ থেকে সরে গেলে ইরান আরও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। সাবেক কূটনীতিক কুরুশ আহমাদি এটিকে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এর ফলে মধ্যস্থতাকারীদের কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

অন্যদিকে সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশেষজ্ঞ সিনা তুসি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর শান্তিপ্রিয় থাকার পক্ষে যুক্তি দেওয়া এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। ট্রাম্পের হামলা উল্টো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পক্ষেই জনমতকে আরও বেশি শক্তিশালী করছে।
সম্প্রতি তেহরানে জুমার নামাজে ইমাম মোহাম্মদ জাভাদ হাজ আলী আকবারি যখন ঘোষণা দেন যে ইরানের পারমাণবিক নীতিতে পরিবর্তন আনা এখন ‘জাতীয় দাবি’, তখন উপস্থিত মুসল্লিরা পুরোনো সেই ‘পারমাণবিক শক্তি আমাদের অবিচ্ছেদ্য অধিকার’ স্লোগান তুললে তিনি হেসে বলেন, “এটি পুরোনো স্লোগান। আমরা এর চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছি। এই দৃশ্যই প্রমাণ করে, তেহরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে এক অভাবনীয় ও বিপজ্জনক মোড় নেওয়ার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
